ভারত থেকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ প্রত্যাবাসনে ঢাকার সহযোগিতা চাইল দিল্লি। তারেক রহমানের সঙ্গে মোদি সরকারের আস্থার সংকট ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন মোড় নিয়ে বিশ্লেষণ।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ঐতিহাসিক জয়ের পর দিল্লির সুর ও মেজাজে যে পরিবর্তন এসেছে, তা বাংলাদেশের বর্তমান তারেক রহমান সরকারের জন্য এক অশনি সংকেত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্য সেই জল্পনাকেই উসকে দিয়েছে। ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার সহযোগিতা চেয়ে দিল্লির এই প্রকাশ্য অবস্থান আসলে দীর্ঘদিনের জমে থাকা আস্থার সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ।
রণধীর জয়সওয়ালের বার্তা: ২৮৬২টি মামলার পাহাড়
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে রণধীর জয়সওয়াল অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বাংলাদেশের কোর্টে বল ঠেলে দিয়েছেন।
তিনি জানিয়েছেন, ভারতে অবস্থানরত কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য ২৮৬২টিরও বেশি মামলা বাংলাদেশে বিচারাধীন রয়েছে।
এর মধ্যে অনেক মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।
ভারতের এই দাবিটি এমন এক সময়ে এল, যখন পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে ‘পুশ ব্যাক’ বা অনুপ্রবেশ ইস্যুটি কেন্দ্রে চলে এসেছে।
জয়সওয়াল স্পষ্ট করেছেন যে, এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সফল করতে বাংলাদেশের সক্রিয় সহযোগিতা এখন সময়ের দাবি।
তারেক রহমান ও মোদি সরকার: বিশ্বাসের ভাঙন?
রাজনৈতিক মহলে চাউর আছে যে, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ভারতের সাথে কিছু বিশেষ নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা নিয়ে দিল্লির সাউথ ব্লকে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
- বাতিল সফর: প্রথা অনুযায়ী নির্বাচনের পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর দিল্লিতে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আস্থার সংকটের কারণে ভারত ইতিমধ্যে সেই সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে।
- পুরনো ছায়া: ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সেই কথিত ‘জঙ্গিবাদের মদতদাতা’ ইমেজ থেকে তারেক রহমান বের হতে পেরেছেন কি না, তা নিয়ে দিল্লি পুনরায় সন্দিহান হয়ে উঠেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে নতুন করে সম্পর্কের যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য লাল সংকেত।
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি জয় ও বাংলাদেশের অস্বস্তি
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়লাভের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান একটি বিবৃতি দিয়েছেন।
সেই বিবৃতির প্রেক্ষাপটে জয়সওয়াল যেভাবে পুশ-ব্যাকের ইঙ্গিত দিলেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিজেপি যখন ‘অনুপ্রবেশকারী’ হঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয়ী হয়, তখন দিল্লির পক্ষে সেই চাপ সামলানো কঠিন।
ভারতের এই অবস্থান মূলত তারেক সরকারকে একটি কঠিন বার্তা দিচ্ছে—হয় প্রতিশ্রুতি পালন করো, না হয় নতুন উত্তেজনার জন্য প্রস্তুত থাকো।
জঙ্গিবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ: ভারতের রেড লাইন
ভারতের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলো তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা।
অতীতে বিএনপির শাসনের সময় উলফা (ULFA)-সহ বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার যে অভিযোগ ছিল,
তার পুনরাবৃত্তি ভারত কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
বর্তমান গোয়েন্দা রিপোর্টগুলো যদি তারেক সরকারের সঙ্গে এসব গ্রুপের নতুন কোনো ধারার সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়,
তবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এক ভয়ংকর সংঘাতের দিকে মোড় নিতে পারে।
তারেক সরকারের কপালে কী আছে?
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সামনে এখন মাত্র দুটি পথ খোলা রয়েছে:
১. আস্থা পুনরুদ্ধার: দ্রুত দিল্লিতে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়ে নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতের উদ্বেগ নিরসন করা এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা।
২. সংঘাতের পথে হাঁটা: যদি বিএনপি সরকার পুনরায় পাকিস্তান বা অন্য কোনো আঞ্চলিক শক্তির দিকে ঝুঁকে ভারত-বিরোধী নীতি গ্রহণ করে,
তবে দিল্লির পক্ষ থেকে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘুম ভাঙার সময় এখনই
রণধীর জয়সওয়ালের এই বক্তব্য কেবল একটি কূটনৈতিক ব্রিফিং নয়, এটি একটি আগাম সর্তকতা।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে বুঝতে হবে যে, স্থিতিশীল প্রতিবেশী ছাড়া অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন অসম্ভব।
যদি ‘শুভ বুদ্ধির’ উদয় না হয় এবং পুরনো উগ্রবাদী পথে দেশ পরিচালিত হয়, তবে সামনে এক অন্ধকার সময় অপেক্ষা করছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারত কেবল একটি প্রতিবেশী নয়, বরং একটি বড় শক্তি, যার বিশ্বাস ভঙ্গ করা যেকোনো ছোট দেশের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
সময় থাকতে তারেক রহমানের ঘুম ভাঙবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়। নতুবা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যে সবসময় সুখকর হয় না, তা বিএনপি নেতৃত্ব ভালো করেই জানেন।
