ক্রুজ শিপ এমভি হন্ডিয়াস-এ হান্টাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে ৩ জনের মৃত্যু। আর্জেন্টিনা থেকে শুরু হওয়া এই সংক্রমণ ও ডব্লিউএইচও-র বৈশ্বিক সতর্কতা নিয়ে পড়ুন বিস্তারিত।
বিশ্ব যখন নতুন কোনো মহামারীর আশঙ্কা থেকে মুক্তি খুঁজছে, ঠিক তখনই দক্ষিণ আটলান্টিকের নীল জলরাশিতে ভেসে বেড়ানো একটি প্রমোদতরি ‘এমভি হন্ডিয়াস’ (MV Hondius) নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম উদ্বেগ। ক্রুজ শিপটিতে বিরল কিন্তু অত্যন্ত প্রাণঘাতী হান্টাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। ইতিমধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
ট্র্যাজেডির শুরু: ডাচ দম্পতি ও জার্মান পর্যটকের মৃত্যু
গত মাসে আর্জেন্টিনা থেকে রওনা হওয়ার পর থেকেই জাহাজে থাকা যাত্রীদের মধ্যে রহস্যময় অসুস্থতা লক্ষ্য করা যায়। প্রথম মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে ১১ এপ্রিল, যখন ৭০ বছর বয়সী এক ডাচ পর্যটক জ্বর, মাথাব্যথা এবং তীব্র পেটের সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রী এবং আরও এক জার্মান নাগরিক একই উপসর্গে প্রাণ হারান। দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ভাইরাসের দাপটে রোগীদের ফুসফুস ও কিডনি দ্রুত বিকল হয়ে পড়েছিল।

আন্দিজ স্ট্রেইন: কেন এই প্রাদুর্ভাব বেশি বিপজ্জনক?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে রয়েছে হান্টাভাইরাসের বিশেষ ‘আন্দিজ স্ট্রেইন’ (Andes strain)।
সাধারণত হান্টাভাইরাস ইঁদুর বা বন্যপ্রাণীর মলমূত্র থেকে ছড়ালেও, এই নির্দিষ্ট স্ট্রেইনটি ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা রাখে।
এই বিরল বৈশিষ্ট্যের কারণেই আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো এটিকে গুরুত্বের সাথে দেখছে।
আইসোলেশনে ১৪৬ যাত্রী: মাঝসমুদ্রে চিকিৎসার সংকট
ক্রুজ অপারেটর ‘ওশানওয়াইড এক্সপেডিশনস’ জানিয়েছে, বর্তমানে ২৩টি দেশের ১৪৬ জন যাত্রী ও ক্রু কঠোর কোয়ারেন্টাইনের মধ্যে রয়েছেন।
এদের মধ্যে ১৭ জন মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন। একটি সংকটময় মুহূর্তে জাহাজের প্রধান চিকিৎসক নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়লে, যাত্রী হিসেবে থাকা ড. স্টিফেন কর্নফেল্ড চিকিৎসার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তিনি সিএনএন-কে জানান, মাত্র ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সুস্থ মানুষগুলো মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ছিলেন।
ইতিমধ্যে সংকটাপন্ন কয়েকজনকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে ইউরোপে স্থানান্তর করা হয়েছে।
আর্জেন্টিনা ও চিলি সংযোগ: সংক্রমণের উৎস সন্ধানে
তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, যাত্রীরা জাহাজে ওঠার আগেই ভাইরাসটির সংস্পর্শে এসেছিলেন।
মৃত ডাচ দম্পতি গত নভেম্বরে দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের সময় আর্জেন্টিনা ও চিলির বিভিন্ন বন্য এলাকা ঘুরে দেখেছিলেন।
বিশেষ করে ‘পাখি দেখা’র নেশায় তাঁরা এমন কিছু জঙ্গলে গিয়েছিলেন যা হান্টাভাইরাস-প্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত।
নেউকেন এবং মিসিওনেস এলাকায় ইঁদুর পরীক্ষার জন্য ইতিমধ্যে কারিগরি দল মোতায়েন করেছে আর্জেন্টিনা কর্তৃপক্ষ।
কোভিড-১৯-এর স্মৃতির পুনরাবৃত্তি?
এমভি হন্ডিয়াসের এই পরিস্থিতি অনেককে ২০২০ সালের শুরুতে ডায়মন্ড প্রিন্সেস ক্রুজ শিপে কোভিড প্রাদুর্ভাবের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
অনেক যাত্রী পরিস্থিতি বোঝার আগেই সেন্ট হেলেনার মতো দুর্গম দ্বীপে নেমে গিয়েছেন, যা কন্টাক্ট ট্রেসিং প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।
তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশ্বস্ত করেছে যে, এটি বড় আকারের মহামারী হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তেনেরিফে বন্দরে পরবর্তী পদক্ষেপ
আগামী রবিবার জাহাজটি স্পেনের তেনেরিফে (Tenerife) বন্দরে ভিড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। সেখানে স্প্যানিশ স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষ দল যাত্রীদের নামানোর প্রক্রিয়া তদারকি করবে।
প্রতিটি যাত্রীকে স্ক্রিনিং ও আইসোলেশনের ধাপ পেরিয়ে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
পর্যটকদের জন্য সতর্কতা
হান্টাভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশ পেতে এক থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
তাই যারা সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকা বা সংশ্লিষ্ট ক্রুজ শিপে ভ্রমণ করেছেন, তাদের বিশেষ নজরদারিতে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে একটি ছোট বন্যপ্রাণী বাহিত ভাইরাসও যে কতটা দ্রুত সীমান্ত ছাড়িয়ে আতঙ্ক ছড়াতে পারে, এমভি হন্ডিয়াস ট্র্যাজেডি তারই এক নিষ্ঠুর স্মারক।
