পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের পরপরই ২৬ পাকিস্তানীর ঢাকা আগমন। গুলশানের হোটেলে অবস্থান ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বর্তমান সম্পর্ক যেন এক রহস্যঘেরা গোলকধাঁধা। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির নজিরবিহীন এবং বিতর্কিত ঢাকা সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার রাজধানীর গুলশানে পা রাখল ২৬ সদস্যের এক বিশাল পাকিস্তানী বহর। আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, ১১ মে আয়োজিত ‘পাকিস্তান এডুকেশন এক্সপো’তে অংশ নিতেই তাদের এই আগমন। তবে সফরের সময়কাল, বহরের আকার এবং পর্দার আড়ালের তৎপরতা দেখে খোদ নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মনেই উঁকি দিচ্ছে নানা প্রশ্ন—আসলে কি এটি শুধুই শিক্ষার প্রসার, না কি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো ‘অ্যাসাইনমেন্ট’?
গুলশানের লেক ক্যাসেল: পাকিস্তান হাই কমিশনের কড়া নজরদারি
পাকিস্তান হাই কমিশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই ২৬ জন পাকিস্তানী বর্তমানে গুলশানের ‘লেক ক্যাসেল’ হোটেলে অবস্থান করছেন।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই বিশাল বহরটি বাংলাদেশে আসার ঠিক একদিন আগেই পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর ঝটিকা সফর শেষ করেছেন।
কূটনৈতিক শিষ্টাচার অনুযায়ী এ ধরণের এক্সপোতে সাধারণত অল্প কিছু প্রতিনিধি অংশ নেন,
কিন্তু ২৬ জনের এই ‘জ্যাম্বো বহর’ কোনো স্বাভাবিক শিক্ষা মেলা বা প্রদর্শনীতে দেখা যায় না।
এডুকেশন এক্সপো বনাম বাস্তবতা: লাভ-ক্ষতির অঙ্ক
প্রশ্ন উঠেছে, পাকিস্তান কেন এই মুহূর্তে বাংলাদেশে শিক্ষা মেলার জন্য এতো অর্থ এবং জনবল ব্যয় করছে?
- ছাত্র বিনিময়ের হার: পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে পড়তে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন নগণ্য, তেমনি বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে পড়তে যাওয়ার হারও নামমাত্র। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এমন এক বিশাল ব্যয়বহুল আয়োজন করা কতটা যৌক্তিক?
- গোপন খরচ: একটি এক দিনের মেলার জন্য ২৬ জনের যাতায়াত, গুলশানের অভিজাত হোটেলে দীর্ঘ অবস্থান এবং আনুষঙ্গিক খরচ পাকিস্তান কেন বহন করছে? এর ব্যবসায়িক বা শিক্ষাগত লাভ আসলে কী?
সফর দীর্ঘায়িত করার নেপথ্যে কী?
সবচেয়ে বড় সন্দেহের জায়গাটি হলো অবস্থানের সময়সীমা।
১১ মে এক্সপো শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জানা গিয়েছে, এই বহরের বেশিরভাগ সদস্য আরও অন্তত দশ দিন বাংলাদেশে অবস্থান করবেন।
- বাকি ১০ দিনের পরিকল্পনা কী? মেলা শেষ হওয়ার পর তারা কোথায় যাবেন, কার সাথে দেখা করবেন—তা নিয়ে পাকিস্তান হাই কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ঘোষণা নেই।
- নিরাপত্তা ঝুঁকি: গোয়েন্দা সূত্রগুলো মনে করছে, এই দীর্ঘ অবস্থানে তারা দেশের বিভিন্ন সংবেদনশীল গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসতে পারেন।
গণমাধ্যমের নীরবতা ও ফেসবুক ভিত্তিক প্রচার
সাধারণত যেকোনো আন্তর্জাতিক এক্সপো নিয়ে বড় বড় গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়।
কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো,
এই ‘পাকিস্তান এডুকেশন এক্সপো’ নিয়ে পাকিস্তান হাই কমিশনের একটি ফেসবুক পোস্ট ছাড়া আর কোথাও তেমন কোনো আলোচনা বা বিজ্ঞাপন দেখা যায়নি।
- গোপনীয়তার উদ্দেশ্য কী? যদি এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মহৎ উদ্দেশ্য হয়, তবে কেন সাধারণ নাগরিকদের কাছে এর প্রচার এতো সীমিত?
- টার্গেটেড অডিয়েন্স কারা? অনেকে মনে করছেন, এটি কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, বরং বিশেষ কিছু ‘প্রক্সি’ বা নির্দিষ্ট মতাদর্শের অনুসারীদের সাথে সংযোগ স্থাপনের একটি আবরণ মাত্র।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সাথে সংযোগ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি যে ‘পারস্পরিক গোয়েন্দা সহযোগিতা’ চুক্তির ভিত্তি গড়ে দিয়ে গেছেন,
এই ২৬ সদস্যের বহর কি সেই চুক্তির অপারেশনাল শাখা হিসেবে কাজ করতে এসেছে?
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে,
গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং নেটওয়ার্ক বিস্তারের কাজে এ ধরণের ‘সিভিলিয়ান কভার’ বা অসামরিক পোশাক ব্যবহার করা পাকিস্তানের পুরনো কৌশল।
কড়া নজরদারি এখন সময়ের দাবি
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে পাকিস্তান যেভাবে তাদের উপস্থিতি জোরদার করছে, তা প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের ওপর বড় ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষার কথা বলে দেশে আসা এই ২৬ জন আসলে কি করছেন, তারা কোথায় যাতায়াত করছেন—তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থেই জরুরি।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসনের এই ‘পাকিস্তান তোষণ’ নীতি কি তবে বাংলাদেশকে বড় কোনো আঞ্চলিক ষড়যন্ত্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? এই জবাব খুঁজে বের করার দায়িত্ব এখন সচেতন দেশপ্রেমিক জনতার।
