হাম ও স্বাস্থ্য সংকটে সন্তানহারা ৪০৯ জন মায়ের কান্না। কনিকা আক্তারের যমজ সন্তানের বিয়োগান্তক গল্প ও প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে মা দিবসের বিশেষ প্রতিবেদন।
আজ ১০ মে, বিশ্ব মা দিবস। যখন সারা পৃথিবীর সন্তানরা তাদের মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই বাংলাদেশের ৪০৯ জন মায়ের কোল আজ শূন্য। এই মায়েরা তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন এমন এক সময়ে, যখন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এক চরম নৈরাজ্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে হামের প্রকোপ এবং চিকিৎসা সেবার অপ্রতুলতায় যেসব প্রাণ ঝরে গেছে, সেই ৪০৯ জন মায়ের পক্ষ থেকে আজ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুস এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে এক নীরব ও যন্ত্রণাকাতর ‘শুভেচ্ছা’ জানানো হয়েছে। এই শুভেচ্ছা আনন্দের নয়, বরং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার এক চরম ধিক্কার।
কনিকা আক্তারের যমজ সন্তানের বিয়োগান্তক উপাখ্যান
চলতি বছর স্বাস্থ্য সংকটের এক মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন কনিকা আক্তার।
ছবিতে দেখা যাওয়া এই মায়ের কোলে আজ কোনো সন্তান নেই।
উনার যমজ সন্তানের একজন হামে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন।
অন্যজন হাসপাতালের সাদা চাদরের ওপর জীবনের সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।
কনিকা আক্তারের মতো শত শত মায়ের কান্না আজ কোনো নীতিনির্ধারকের কানে পৌঁছাচ্ছে না।
হাসপাতালের করিডোরে যখন একজন মা তাঁর নিথর সন্তানকে নিয়ে বসে থাকেন,
তখন তথাকথিত ‘নতুন বাংলাদেশ’ বা ‘বৈষম্যহীন সমাজ’-এর শ্লোগানগুলো এক নিষ্ঠুর পরিহাস বলে মনে হয়।
৪০৯ জন মায়ের শোকাতুর মিছিল: কেন এই অকাল মৃত্যু?
সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রয়োজনীয় টিকা ও চিকিৎসা সেবার অভাবে ৪০৯ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
- টিকার সংকট: দেশের অনেক দুর্গম এলাকায় সময়মতো হামের টিকা না পৌঁছানোয় এই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়েছে।
- হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা: শিশু ওয়ার্ডগুলোতে বেড না থাকা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব মায়েদের অসহায় করে তুলেছে।
- প্রশাসনিক উদাসীনতা: ড. ইউনুস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন যখন বড় বড় সংস্কারের কথা বলছে, তখন তৃণমূলের শিশুদের জীবন রক্ষায় তাদের কার্যক্রম ছিল অত্যন্ত সীমিত।
মা দিবসের সেই ‘বিশেষ’ শুভেচ্ছা ও নীরব প্রতিবাদ
এই প্রতিবেদনে ৪০৯ জন মায়ের পক্ষ থেকে যে শুভেচ্ছার কথা বলা হয়েছে, তার পরতে পরতে মিশে আছে ক্ষোভ।
১. নূরজাহান বেগমের প্রতি প্রশ্ন: একজন নারী এবং উপদেষ্টা হিসেবে তিনি কি এই মায়েদের চোখের জল মুছতে পেরেছেন?
২. ড. ইউনুসের প্রতি বার্তা: বিশ্বজুড়ে মানবিকতার কথা বললেও নিজ দেশের শিশুদের অকাল মৃত্যু কি তাঁর বিবেককে নাড়া দেয় না?
৩. বিচারের দাবি: এই ৪০৯টি মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কি কখনো জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে?
স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয় ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা
বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য খাত যেন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে।
- সংস্কার বনাম জীবন: প্রশাসনিক সংস্কারের নামে যখন দীর্ঘ সময় ব্যয় করা হয়, তখন জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীরা অবহেলার শিকার হয়।
- মায়ের আর্তনাদ বনাম উন্নয়ন: ড. ইউনুসের সরকার যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ব্যস্ত, তখন দেশের অভ্যন্তরে শিশুদের এই মৃত্যু মিছিল সরকারের ব্যর্থতাকেই প্রমাণ করে।
- বৈষম্যের নতুন রূপ: বিত্তবানরা উন্নত চিকিৎসা পেলেও কনিকা আক্তারের মতো সাধারণ মায়েরা হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সন্তানদের রক্ষা করতে পারছেন না।
ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে এই কান্না
মা দিবস আসবে-যাবে, কিন্তু ৪০৯ জন মায়ের বুকের যে হাহাকার, তা কখনও মুছে যাবে না।
ড. ইউনুস ও নূরজাহান বেগম হয়তো ফাইলবন্দি পরিসংখ্যানে এই মৃত্যুগুলোকে দেখবেন, কিন্তু কনিকা আক্তাররা সারাজীবন বয়ে বেড়াবেন এক অপূরণীয় ক্ষতি।
সময় এসেছে কেবল শ্লোগান না দিয়ে বাস্তবমুখী স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার।
যদি আজ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে আগামী প্রজন্ম এই অকৃতজ্ঞ ও ব্যর্থ প্রশাসনের কথা ইতিহাসের পাতায় কালো অক্ষরে লিখে রাখবে।
৪০৯ জন মায়ের পক্ষ থেকে এই ‘মা দিবসের শুভেচ্ছা’ আসলে এক তীব্র প্রতিবাদ—যে প্রতিবাদ বিচার চায়, নিরাপত্তা চায় এবং সন্তানদের ফিরে পাওয়ার অসম্ভব এক আকুতি জানায়।
