জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের শহীদ গেজেটে বড় জালিয়াতির অভিযোগ। ছাদ থেকে পড়ে মৃত মিরপুরের ব্যবসায়ী মোঃ আখতারুজ্জামান নাঈমের নাম কীভাবে এলো সরকারি তালিকায়? জানুন বিস্তারিত।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণ-আন্দোলন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রকাশ করা হয়েছে ‘শহীদ গেজেট’। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে প্রাণ হারানো বীরদের আত্মত্যাগকে স্বীকৃতি দিতে এই তালিকা করা হলেও, এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। গেজেট তৈরির প্রক্রিয়ায় চরম গাফিলতি ও জালিয়াতির এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে মিরপুরের এক ব্যবসায়ীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। সরকারি গেজেটের ৩০২ নম্বর ক্রমিকে স্থান পাওয়া মোঃ আখতারুজ্জামান নাঈম নামের ওই ব্যক্তি আসলে আন্দোলনের গুলিতে নন, বরং বহুতল ভবনের ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছেন বলে চিকিৎসকের নথিতে প্রমাণিত হয়েছে।
কে ছিলেন এই আখতারুজ্জামান নাঈম?
নিহত মোঃ আখতারুজ্জামান নাঈম মিরপুর এলাকার একজন সুপরিচিত ব্যবসায়ী ছিলেন।
তিনি মূলত খাদ্যপণ্যের ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন এবং পাশাপাশি শেয়ারবাজারেও তাঁর বড় বিনিয়োগ ছিল। এছাড়া মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত ‘হোটেল ঢাকা প্যালেস’ নামের একটি আবাসিক হোটেলের অংশীদার বা পার্টনার ছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে মিরপুর শাহ আলীর ‘এ’ ব্লকের গরিবে নেওয়াজ এলাকায় বসবাস করছিলেন।

পরিবারের বয়ান: মৃত্যুর ঠিক আগে যা ঘটেছিল
নাঈমের পারিবারিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২৬ জুলাই ২০২৪ সকালে তিনি বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেননি।
তবে এর পরের দিন, অর্থাৎ ২৭ জুলাই রাত ৮টার দিকে তাঁর স্ত্রী সুমি আক্তার (বিলকিস)-এর সাথে মোবাইল ফোনে তাঁর স্বাভাবিক কথাবার্তা হয়।
এই ফোনালাপের মাত্র আধা ঘণ্টা পরই একটি অপরিচিত নম্বর থেকে বিলকিসের মোবাইলে কল আসে।
অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, নাঈম হোটেলের ৬ তলার ছাদ থেকে নিচে পড়ে গেছেন এবং তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
পরবর্তীতে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর রাত পৌনে ১২টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
চিকিৎসকের ডেথ সার্টিফিকেট: কী ছিল মৃত্যুর আসল কারণ?
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ইস্যু করা অফিশিয়াল মৃত্যু সনদে (Death Certificate) নাঈমের মৃত্যুর যে কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, তার সাথে আন্দোলনের কোনো সম্পর্কই নেই।
হাসপাতালের নথিতে চিকিৎসকেরা স্পষ্ট লিখেছেন:
- মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ: প্রাইমারী ব্রেন ইনজুরি বা প্রাথমিক মস্তিষ্কের আঘাত ($Primary\ Brain\ Injury$)
- আঘাতের উৎস: উচ্চস্থান থেকে পতন ($Fall\ from\ Height$)
- আঘাত থেকে মৃত্যুর সময়কাল: আড়াই ঘণ্টা
সরকারি এই চিকিৎসা নথি প্রমাণ করে যে, নাঈমের শরীরে কোনো বুলেটের আঘাত ছিল না, বরং ওপর থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
পারিবারিক সন্দেহ ও গেজেটের কাল্পনিক দাবি
নাঈমের রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে তাঁর স্ত্রী বিলকিস এবং ছোট ভাই আসাদুজ্জামান রায়হানের মনে কিছু প্রশ্ন রয়েছে।
তাঁদের মতে, ৬ তলার ছাদ থেকে পড়লে হাত-পা ভাঙার কথা থাকলেও নাঈমের শরীরে তেমন কোনো জখম ছিল না, কেবল মাথার পেছনে একটি গভীর ক্ষত ছিল। এটি ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া নাকি কোনো অভ্যন্তরীণ শত্রুতার জেরে হাতুড়ি বা ভারী কিছু দিয়ে আঘাত—তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও, পরিবারের কেউই একে পুলিশের গুলি বলে দাবি করেননি।
অথচ, সরকারি ‘শহীদ গেজেটে’ নাঈমের মৃত্যুর বিবরণ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে সাজানো হয়েছে। গেজেটে দাবি করা হয়েছে:
২৭ জুলাই মিরপুর ১ নম্বরে আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের সংঘর্ষ চলাকালে নাঈমের মাথার পেছন দিক থেকে গুলি ঢুকে সামনে দিয়ে বের হয়ে যায় এবং তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।
নথি বনাম গেজেট: তিনটি প্রধান অসঙ্গতি
সরকারি গেজেটের দাবির সাথে হাসপাতালের চিকিৎসা সনদের বৈসাদৃশ্যগুলো নিচে ছক আকারে তুলে ধরা হলো:
| তুলনার বিষয় | শহীদ গেজেটের দাবি | হাসপাতালের চিকিৎসা সনদ ও বাস্তব তথ্য |
| ১. মৃত্যুর কারণ | আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বন্দুকের গুলি | বহুতল ভবনের ছাদ থেকে নিচে পতন |
| ২. মৃত্যুর স্থান ও সময় | মিরপুর ১-এর রাস্তায় ঘটনাস্থলেই তাৎক্ষণিক মৃত্যু | আঘাত পাওয়ার আড়াই ঘণ্টা পর ঢাকা মেডিকেলে মৃত্যু |
| ৩. সর্বশেষ অবস্থান | ২৭ জুলাই দিনের বেলা আন্দোলনের মাঠে সক্রিয় উপস্থিতি | ২৭ জুলাই রাত ৮টায় স্ত্রীর সাথে স্বাভাবিক ফোনালাপ |
উলেখ্য, ঘটনার দিন অর্থাৎ ২৭ জুলাই ২০২৪ তারিখে মিরপুর বা রাজধানীর কোথাও যৌথ বাহিনীর গুলিবর্ষণে কোনো আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার ঘটনার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা গণমাধ্যম সূত্রীয় রেকর্ড নেই।
আর্থিক সুবিধার লোভ নাকি অন্য কিছু?
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর নাঈমের পরিবার তাঁকে ‘শহীদ’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আবেদন জানায়।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, একজন তালিকাভুক্ত শহীদের পরিবার সরকারের পক্ষ থেকে একটি ফ্ল্যাট, মাসিক নিশ্চিত ভাতা, পরিবারের সদস্যের জন্য সরকারি চাকরি এবং এককালীন ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র পাওয়ার যোগ্য। বিশাল অংকের এই রাষ্ট্রীয় অনুদান ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার লোভেই এই জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।
জরুরি ভিত্তিতে স্বাধীন তদন্তের দাবি
এই ঘটনাটি সামনে আসার পর জুলাই গেজেটের স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে চরম ক্ষোভ ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রকৃত শহীদদের আত্মত্যাগকে অক্ষুণ্ন রাখতে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধে তিনটি বিষয়ে অবিলম্বে তদন্তের দাবি উঠেছে:
- ব্যবসায়ী আখতারুজ্জামান নাঈমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও হোটেল ঢাকা প্যালেসের ছাদে ঠিক কী ঘটেছিল তা উদ্ঘাটন করা।
- মেডিকেল সার্টিফিকেট সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কোন প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে গেজেটে কাল্পনিক ‘গুলির গল্প’ যুক্ত করা হলো তা খতিয়ে দেখা।
- শহীদ তালিকা প্রস্তুতকারী কমিটির যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় আর কতজন এমন ভুয়া বা অসংগতিপূর্ণ নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা খুঁজে বের করতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা।
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্য জানতে নিহতের পরিবার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং শহীদ তালিকা প্রস্তুতকারী কমিটির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
