খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির পররাষ্ট্রনীতিতে বড় বদল। আমেরিকা ছেড়ে রাশিয়া ও ব্রিকসের দিকে ঝুঁকছে সরকার? জানুন এর ভেতরের ভূরাজনৈতিক জটিলতা।
বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা: বাংলাদেশের ক্ষমতার অলিন্দে এখন এক নতুন সমীকরণের গুঞ্জন। রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—তাহলে কি সত্যিই বদলে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপির ভূরাজনৈতিক ‘কিবলা’ বা কৌশলগত দিকনির্দেশনা? এতদিন যে দলটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো, বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক কিছু নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপে সেই ধারণায় বড় ধাক্কা লেগেছে। ওয়াশিংটনের বলয় থেকে বেরিয়ে ঢাকা এখন মস্কো এবং বেইজিংয়ের দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে বলে জোরালো আভাস মিলছে। এই কৌশলগত পরিবর্তনের পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রশাসনকে উপেক্ষা করার চেষ্টা নাকি কোনো গভীর ফাঁদ লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধোঁয়াশাপূর্ণ পরিস্থিতি।
রোসাটমের দ্বারে খলিলুর রহমান: অতীত বিরোধের নাটকীয় মোড়
বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতার সমীকরণে খলিলুর রহমানের ভূমিকা বেশ প্রভাবশালী।
তবে সবচেয়ে বেশি চমক সৃষ্টি করেছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা ‘রোসাটম’ (ROSATOM)-এর সাথে তাঁর সাম্প্রতিক যোগাযোগ।
ফিরে তাকালে দেখা যায়, এই রোসাটমকে নিয়ে অতীতে তীব্র জলঘোলা করেছিল বিএনপি।
দলটির পক্ষ থেকে একাধিকবার অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে,
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের চুক্তি বজায় রাখতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ ঘুষ দিয়েছিল এই রুশ প্রতিষ্ঠানটি।
সে সময় রোসাটম অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই অভিযোগের প্রতিবাদ জানায় এবং একে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয়।
অথচ আজ রাজনীতির পাশার দান এমনভাবে উল্টে গেছে যে, সেই ‘অভিযুক্ত’ রোসাটমের দোরগোড়াতেই খলিলুর রহমানকে ধর্ণা দিতে হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, যে প্রতিষ্ঠানটির সততা নিয়ে বিএনপি একসময় আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন তুলেছিল,
আজ কোন বাধ্যবাধকতায় তাদের সাথেই নতুন করে সম্পর্ক জোড়া লাগাতে চাইছে এই সরকার?
ব্রিকস ও এসসিও-তে যোগদানের মরিয়া চেষ্টা: মার্কিন বলয় ভাঙার ইঙ্গিত?
কেবল রাশিয়ার সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই নয়, বহুপাক্ষিক কূটনীতিতেও বড় ধরনের বাঁক বদলের চেষ্টা করছে বিএনপি সরকার।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত দুটি জোট—‘ব্রিকস’ (BRICS) এবং ‘সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা’ (SCO)-তে অন্তর্ভুক্ত হতে ঢাকা এখন বেশ মরিয়া।
এই দুটি সংস্থাই বিশ্বমঞ্চে ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State)-এর নজরদারির বিরুদ্ধে বিকল্প মেরু গড়ে তোলার কাজ করছে।
ফলে, এই জোটে যোগ দেওয়ার জন্য বিএনপির এই অতি-উৎসাহকে ওয়াশিংটন যে সহজভাবে নেবে না, তা বলাই বাহুল্য।
তবে কি খলিলুর রহমান এবং বর্তমান নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে পেরেছেন যে মার্কিন প্রশাসনের অন্ধ সমর্থন চিরকাল পাওয়া যাবে না? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো হিসাব কাজ করছে?
তারেক রহমান সরকারের জন্য কি এটি কোনো সুদূরপ্রসারী ফাঁদ?
এই নাটকীয় পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনের নেপথ্যে খলিলুর রহমানের প্রকৃত আনুগত্য নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মনে গভীর সংশয় দানা বেঁধেছে।
এই মহলের মতে, খলিলুর রহমান মনেপ্রাণে শান্তিতে নোবেলজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের আদর্শের অনুসারী এবং মার্কিন ‘ডিপ স্টেট’-এর অত্যন্ত বিশ্বস্ত বা ‘ব্লু আইড বয়’ হিসেবে পরিচিত।
এমন একজন মানুষ হঠাৎ করে কেন বিএনপি সরকারকে আমেরিকা-বিরোধী হিসেবে পরিচিত রাশিয়া বা চীনের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, তা ভাববার বিষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের আশঙ্কা:
এটি হয়তো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে এক কঠিন আন্তর্জাতিক ফাঁদে ফেলার সুদূরপ্রসারী কৌশল। ট্রাম্প প্রশাসন যদি দেখতে পায় যে বিএনপি মার্কিন স্বার্থকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মস্কো-বেইজিং অক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, তবে হোয়াইট হাউস নিশ্চিতভাবেই ক্ষুব্ধ হবে। এর ফলে মার্কিন প্রশাসনের বিরাগভাজন হয়ে তারেক রহমানের সরকার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক স্তরে বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
গোলামী চুক্তির কুফল এবং বেইজিং-মস্কো অক্ষের আশ্রয়
অন্য একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব বলছে, হয়তো ক্ষমতার আসার পর আমেরিকার সাথে করা কোনো গোপন বা কথিত ‘গোলামী চুক্তি’র নেতিবাচক প্রভাব টের পেতে শুরু করেছে বিএনপি।
ওয়াশিংটনের অতিরিক্ত শর্ত বা সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপের চেষ্টা থেকে বাঁচতেই হয়তো তড়িঘড়ি করে চীন ও রাশিয়াকে পাশে পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
যদি রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলো ঢাকার পাশে এসে দাঁড়ায়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া শর্ত বা চুক্তি বাতিল করা সহজ হবে—এমনটাই হয়তো ভাবছেন নীতিনির্ধারকেরা। বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক সাধারণ এবং দেশপ্রেমিক নাগরিকই মার্কিন ‘দাদাগিরি’র বিরুদ্ধে এই ধরনের বলিষ্ঠ অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
তবে প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের চড়া মূল্য বাংলাদেশকে দিতে হবে কি না।
পাশার দান উল্টে যাওয়ার আভাস: আওয়ামী লীগের দিকে কি ঝুঁকছে ওয়াশিংটন?
সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও বিশ্লেষকদের আলোচনায় একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠছে—আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাশার দান খুব দ্রুত উল্টে যাচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্র ও কূটনৈতিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে,
বর্তমান বিএনপি সরকারের এই মস্কো-মুখী আচরণের জবাবে ওয়াশিংটন এখন বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছে।
মার্কিন প্রশাসন হয়তো ধীরলয়ে সাবেক শাসকদল আওয়ামী লীগের দিকে পুনরায় ঝুঁকতে শুরু করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন প্রশাসন কোনোভাবেই বেইজিং বা মস্কোর সাথে বাংলাদেশের এই মাখামাখি মেনে নেবে না।
রাশিয়ার সাথে নতুন করে বড় ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করা সরাসরি মার্কিন বাণিজ্য নীতি বা পূর্ববর্তী সমঝোতার লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে।
খলিলুর রহমানের এই চালের কারণে মার্কিন ‘ডিপ স্টেট’ কিংবা ট্রাম্প প্রশাসন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না,
বরং এর একটি বড় ধাক্কা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর আসতে পারে।
নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা বনাম জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
যদি বাংলাদেশ সত্যিই ইঙ্গ-মার্কিন বলয় বা তথাকথিত ‘রাহুগ্রাস’ থেকে বেরিয়ে চীন, রাশিয়া এবং ইরানের মতো শক্তির সাথে একটি গভীর কৌশলগত চতুর্মুখী অক্ষ গড়ে তুলতে পারে, তবে তা হবে দেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
বহু স্বৈরাচারী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এটি একটি স্বাধীন দেশের সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
তবে এর বাস্তব পরিণতি হতে পারে বেশ ভয়াবহ।
ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রশাসন যদি এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিংবা বিএনপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক ও মন্ত্রীদের ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) আরোপ করে, তবে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং তৈরি পোশাক খাত (RMG) বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।
পরিশেষে, খলিলুর রহমানের এই ‘কিবলা বদল’ বিএনপিকে এক চরম আন্তর্জাতিক ঘূর্ণাবর্তের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এটি কি বাংলাদেশের প্রকৃত মুক্তির পথ, নাকি সরকারের পতন ডেকে আনার কোনো সুনিপুণ নীল নকশা—তা সময়ই বলে দেবে।
তবে ক্ষমতার শীর্ষমহলকে মনে রাখতে হবে, পরাশক্তিদের মধ্যকার এই লড়াইয়ে চাল ভুল হলে তার খেসারত পুরো দেশবাসীকে দিতে হয়।
