খাগড়াছড়ির গুইমারায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের গোপন বৈঠকের খবরে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন বিএনপির ৬ নেতাকর্মী। বিস্তারিত জানুন এই প্রতিবেদনে।
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি: পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় এক চাঞ্চল্যকর ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের গোপন বৈঠকের খবর পেয়ে তথ্য যাচাই করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন মাঠপর্যায়ের বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মী। দুটি পৃথক স্থানে চালানো এই অতর্কিত হামলায় দলটির অন্তত ছয়জন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। গত বুধবার (১০ জুন) রাতের আঁধারে উপজেলার বড়পিলাক ও বাইল্যাছড়ি নামক দুটি ভিন্ন এলাকায় এই রক্তক্ষয়ী সহিংসতার ঘটনা ঘটে। আহতদের স্থানীয়দের সহায়তায় দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ঘটনার সূত্রপাত: বড়পিলাকের সেই রহস্যময় বাড়ি
স্থানীয় নির্ভরযোগ্য ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র থেকে জানা যায়, বুধবার রাতে গুইমারা উপজেলার হাফছড়ি ইউনিয়নের বড়পিলাক এলাকার একটি বাড়িকে কেন্দ্র করে সন্দেহের দানা বাঁধে।
এলাকায় গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ এবং তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের স্থানীয় কিছু নেতাকর্মী
সেখানে জড়ো হয়ে অত্যন্ত গোপনে একটি সাংগঠনিক বা কৌশলগত বৈঠক করছেন।
এই তথ্য পাওয়ার পরপরই সত্যতা যাচাই করতে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে বিএনপি ও তার বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন স্থানীয় নেতাকর্মী ওই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের সাথে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও কথা কাটাকাটি শুরু হয়।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও হয়।
হামলায় আহত হলেন যারা: ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ
বড়পিলাক এলাকার এই আকস্মিক ও সহিংস হামলায় বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের পাঁচজন নেতাকর্মী গুরুতর জখম হন। আহত ব্যক্তিরা হলেন:
- জাকির হোসেন (সাংগঠনিক সম্পাদক, হাফছড়ি ইউনিয়ন বিএনপি)
- মো. মামুন (আহ্বায়ক, বড়পিলাক ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দল)
- জাহাঙ্গীর আলম রনি (সদস্য, বড়পিলাক ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দল)
- মামুন (স্থানীয় যুবদল নেতা)
- মাহবুব আলম (স্থানীয় যুবদল নেতা)
আহতদের আর্তচিৎকারে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
পরবর্তীতে স্থানীয়রা রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
বাইল্যাছড়িতে দ্বিতীয় দফা হামলা: অতর্কিত আক্রমণের শিকার বাবু
বড়পিলাকের ঘটনার প্রায় সমসাময়িক সময়ে উপজেলার বাইল্যাছড়ি এলাকাতেও আরেকটি পৃথক হামলার ঘটনা ঘটে।
সেখানে বাইল্যাছড়ি ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মো. বাবুর ওপর অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে অতর্কিত হামলা চালানো হয়।
বিএনপির স্থানীয় সূত্রের দাবি,
ছাত্রলীগ কর্মী বাপ্পি ত্রিপুরা কোনো উসকানি ছাড়াই বাবুর ওপর হঠাৎ লাঠিসোঁটা নিয়ে চড়াও হন এবং তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন।
এই হামলায় বাবু শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক আঘাত পান।
তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে দ্রুত খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
“পরিকল্পিত হামলা, নেওয়া হবে আইনি ব্যবস্থা” – বিএনপি সভাপতি
এই জোড়া হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গুইমারা উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম সোহাগ। এক বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করে বলেন:
“বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নেতাকর্মীরা আইন-কানুন ও জনমতকে তোয়াক্কা না করে পাহাড়ি এলাকায় আবারও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বড়পিলাক ও বাইল্যাছড়ির এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ও কাপুরুষোচিত হামলা। আমাদের শান্তিকামী নেতাকর্মীদের ওপর যারা এভাবে অস্ত্র তুলে নিয়েছে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে আমরা অত্যন্ত দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।”
তবে এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে প্রতিপক্ষ বা অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের স্থানীয় কোনো নেতার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি এবং তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি
সার্বিক পরিস্থিতি এবং আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গুইমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহরাওয়ার্দী জানান,
তারা সংঘর্ষ ও মারামারির বিষয়টি মৌখিকভাবে শুনেছেন।
তিনি বলেন, “ঘটনাটি জানার পর থেকেই পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত (রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত) ভুক্তভোগী বা বিএনপির পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ কিংবা মামলা দায়ের করা হয়নি।
আমরা লিখিত অভিযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় আছি।
অভিযোগ বা এজাহার জমা পড়লেই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
বর্তমানে গুইমারা উপজেলার ওই দুটি এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন না করা হলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলের এই শান্ত পরিবেশ ধরে রাখতে প্রশাসনকে দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে, অন্যথায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে রূপ নিতে পারে।
