শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিয়ে তোলপাড়। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতিশোধ ও ২০২৪ সালের আন্দোলনকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের নীরবতা ভাঙলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ‘এই সময়’-কে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া বিচার প্রক্রিয়া, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন নিয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। তাঁর মতে, ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার করার কারণেই আজ তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হচ্ছে।
ট্রাইব্যুনালের রায়: ‘ন্যায়বিচার নয়, প্রতিশোধ’
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কর্তৃক প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ডের আদেশের তীব্র সমালোচনা করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।
সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে যে আইনি প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে, তার কোনো সাংবিধানিক বা আইনি বৈধতা নেই।
শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন:
“১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এই ট্রাইব্যুনালকে পুনর্গঠিত করেছে। আমার বিরুদ্ধে যে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে, তা কোনো আইনি বিচার নয়; বরং এটি ১৯৭১-এর গণহত্যাকারীদের বিচারের একটি চরম প্রতিশোধ।”
তিনি দাবি করেন, বর্তমান প্রশাসন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে এবং আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতেই এই ধরনের ‘ফরমায়েশি’ রায় ঘোষণা করেছে।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলন: ‘একটি পূর্বপরিকল্পিত ব্লুপ্রিন্ট’
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে সংঘটিত গণ-আন্দোলনকে সাধারণ কোনো স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক বিক্ষোভ হিসেবে মানতে নারাজ শেখ হাসিনা।
তাঁর মতে, কোটা সংস্কারের দাবিটি ছিল কেবল একটি বাহ্যিক আবরণ বা উসিলা।
এই প্রসঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলেন:
দেশি-বিদেশি শক্তির ইন্ধন: আন্দোলনটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না।
এর পেছনে শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করার জন্য দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কিছু স্বার্থান্বেষী মহল একযোগে কাজ করেছে।
ড. ইউনূসের বক্তব্য ও ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’: বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি আন্তর্জাতিক মন্তব্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, ড. ইউনূস নিজেই এই আন্দোলনকে ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইনড’ (অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে পরিকল্পিত) বলে স্বীকার করেছেন,
যা প্রমাণ করে এটি একটি গভীর চক্রান্তের ফসল ছিল।
‘ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে বেছে নেওয়া হয়েছিল লাশের রাজনীতি’
ক্ষমতাচ্যুত এই সরকারপ্রধান দাবি করেন,
তৎকালীন আন্দোলনকে সফল করতে এবং সরকারকে কোণঠাসা করতে চক্রান্তকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে রক্তপাতের পথ বেছে নিয়েছিল।
রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করার জন্য এবং আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার লক্ষ্যে ব্যাপক সহিংসতা চালানো হয়েছিল।
তিনি বর্তমান গণমাধ্যমের কিছু স্বীকারোক্তির কথা উল্লেখ করে বলেন,
আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা ছাত্র নেতারা নিজেরাই পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, তাদের পরিকল্পনা কতটা উগ্র ছিল।
সহিংসতা ও সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনা
শেখ হাসিনার দাবি অনুযায়ী, আন্দোলনকারীরা সফল হওয়ার জন্য চরম পন্থার আশ্রয় নিয়েছিল:
১. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা: আন্দোলনকে বেগবান করতে এবং রাষ্ট্রকে স্তব্ধ করতে পরিকল্পিতভাবে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা হয়েছিল।
২. জাতীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন: মেট্রোরেলসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো ছিল সুপরিকল্পিত নাশকতার অংশ।
৩. সশস্ত্র বিদ্রোহের ছক: তিনি আরও অভিযোগ করেন, ছাত্র নেতারা গণমাধ্যমে অকপটে স্বীকার করেছেন যে এই আন্দোলন যদি কোনো কারণে ব্যর্থ হতো, তবে তারা দেশে একটি বড় ধরনের ‘সarmed rebellion’ বা সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘটানোর সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এই সাক্ষাৎকার
শেখ হাসিনার এই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার এমন বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এবং দলের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার একটি কৌশল।
অন্যদিকে, বর্তমান সরকারের সমর্থক এবং সাধারণ ছাত্রনেতারা এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ‘অমূলক এবং অপরাধ ঢাকনোর অপচেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এবং এর সঙ্গে কোনো বিদেশি চক্রান্তের সম্পর্ক নেই।
