কুষ্টিয়ার মিরপুরে মাদক ব্যবসায়ীকে ছাড়াতে থানায় তদবির করতে গিয়ে আটক ৫ বিএনপি ও জামায়াত নেতা। পুলিশের এই সাহসী পদক্ষেপে জনমনে স্বস্তি।
নিজস্ব প্রতিবেদক, মিরপুর | ১০ মে, ২০২৬ কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের মাদক নির্মূল অভিযানের অংশ হিসেবে পুলিশ যখন একজন চিহ্নিত মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে, তখন তাকে রাজনৈতিক প্রভাবে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে মিরপুর থানা পুলিশ। শুধু তাই নয়, তদবির করতে আসা বিএনপি ও জামায়াতের পাঁচ প্রভাবশালী নেতাকে সরাসরি থানা হেফাজতে নেওয়ার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও জনমনে স্বস্তির জোয়ার বয়ে যাচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত: যেভাবে ধরা পড়ল মাদক কারবারি
শনিবার (৯ মে) রাতে মিরপুর থানা পুলিশের একটি চৌকস দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নওদা আজমপুর গ্রামে অভিযান পরিচালনা করে।
উক্ত অভিযানে রমজান আলীর ছেলে এবং এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী রবিউল ইসলামকে (৩৩) বিপুল পরিমাণ মাদকসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।
রবিউলের বিরুদ্ধে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে তরুণ সমাজকে ধ্বংস করার অভিযোগ ছিল।
ক্ষমতার দাপট ও পুলিশের অনড় অবস্থান
রবিউলকে থানায় আনার পর পরই শুরু হয় রাজনৈতিক তদ্বির।
স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত একদল নেতা পুলিশের ওপর চাপ প্রয়োগ করে তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
সাধারণত রাজনৈতিক মদদে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি থাকলেও, মিরপুর থানা পুলিশ এবার ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
তদবির করতে আসা নেতাদের আইনি প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির দায়ে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে হেফাজতে নেয়।
থানা হেফাজতে থাকা ৫ নেতার পরিচয়
পুলিশের তথ্যানুযায়ী, আটককৃত ব্যক্তিরা শুধু তদবিরকারীই ছিলেন না, বরং তারা স্থানীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন।
হেফাজতে থাকা ব্যক্তিরা হলেন: ১. এনামুল হক (৪৫): সদরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও বিএনপি নেতা।
২. আলাউদ্দিন (৪৩): জামায়াত নেতা ও একই ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার প্রার্থী।
৩. সুজন আলী (৩৩): স্থানীয় রাজনৈতিক সক্রিয় কর্মী।
৪. শফিকুল ইসলাম (২৫): যুব রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।
৫. সাইদুল ইসলাম (৩৯): স্থানীয় প্রভাবশলী নেতা।
পুলিশের বক্তব্য: “আইন সবার জন্য সমান”
মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম এই পুরো বিষয়টি নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, মাদক ইস্যুতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন:
“মাদক ব্যবসায়ী সে যে-ই হোক, তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আমাদের কাছে বড় নয়। যারা অপরাধীকে রক্ষা করতে থানায় এসে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবেন, তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই পাঁচজন নেতাকে আটক করার মাধ্যমে আমরা সমাজকে একটি বার্তা দিতে চেয়েছি যে, অপরাধীর কোনো আশ্রয় নেই।”
জনমনে স্বস্তি ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর ও সদরপুর এলাকায় মাদকের অবাধ বিস্তার নিয়ে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত ছিলেন।
বিশেষ করে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদক কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় পুলিশের প্রতি মানুষের একধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু শনিবারের এই ঘটনাটি পুরো দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাজারে মিষ্টি বিতরণ করেছেন অনেকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক বলেন, “আমাদের সন্তানেরা গোল্লায় যাচ্ছিল। পুলিশের এই পদক্ষেপ আমাদের মনে আশা জাগিয়েছে। প্রভাবশালীরা যদি এভাবে আটক হয়, তবে মাদক ব্যবসায়ীরা ভয় পাবে।”
মাদকের বিস্তার ও রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি: একটি বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্রাম্য রাজনীতিতে মাদক কারবারিরা প্রায়ই ভোট ব্যাংক বা অর্থের উৎস হিসেবে কাজ করে। কুষ্টিয়ার এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, অপরাধ যখন রাজনীতির কাঁচামাল হয়ে দাঁড়ায়, তখন সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সদরপুর ইউনিয়নের মতো এলাকায় মাদক ব্যবসার পেছনে যারা নেপথ্যে কারিগর হিসেবে কাজ করে, তাদের মুখোশ উন্মোচিত হওয়া জরুরি। রাজনৈতিক নেতাদের এই ‘তদবির সংস্কৃতি’ বন্ধ না হলে মাদকমুক্ত সমাজ গড়া অসম্ভব।
আইনগত প্রক্রিয়া ও পরবর্তী পদক্ষেপ
আটককৃত নেতাদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং অপরাধীকে সহায়তার অভিযোগে মামলার প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ রবিউলের মাদক নেটওয়ার্ক নিয়ে আরও গভীর তদন্ত শুরু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এলাকার বড় বড় মাদক সিন্ডিকেটের তথ্য বেরিয়ে আসবে।
কুষ্টিয়ার মিরপুর থানা পুলিশের এই দৃঢ় পদক্ষেপ বাংলাদেশের সকল থানার জন্য একটি উদাহরণ হতে পারে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যদি পুলিশ প্রশাসন কাজ করতে পারে, তবেই ‘মাদকমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়া সম্ভব হবে। জনতা এখন রাজপথের চেয়ে আইনের শাসনের ওপর বেশি ভরসা করতে শুরু করেছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে মাদক নির্মূলের লড়াইয়ে জয় অনিবার্য।
