ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলার পরেই উসাইমং মারমার বাড়িতে ডিবি পুলিশের অভিযান। নিরাপত্তা হীনতায় ভোগা এক বাবার চিরকুটে সাহায্যের আবেদন ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন।
গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা নতুন ব্যবস্থার অধীনে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির অবতারণা হয়েছে। রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী উক্য ছাইং মারমার পিতা উসাইমং মারমা এখন প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করার পরপরই তাঁর বাড়িতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানের খবর পাওয়া গেছে। একটি হাতে লেখা চিরকুটের মাধ্যমে তিনি দেশবাসীর কাছে আশ্রয়ের আকুতি জানিয়েছেন, যা বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক নগ্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
ডিবি পুলিশের অভিযান ও মধ্যরাতের আতঙ্ক
উসাইমং মারমার চিরকুটে দেওয়া তথ্যমতে, গত ০৭ মে তারিখে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করার পর থেকেই তাঁর ওপর চাপ বাড়তে থাকে।
আদালত মামলাটি গ্রহণ করলেও পরে খারিজ করে দেয়। এরপরই শুরু হয় হয়রানি।
শুক্রবার রাত আনুমানিক ২টা থেকে ৩টার দিকে রাঙ্গামাটির নিজ এলাকায় উসাইমং ও তাঁর স্ত্রীকে খুঁজতে অভিযানে নামে ডিবি পুলিশ।
পার্শ্ববর্তী বাড়িগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে তাঁদের আটকের চেষ্টা করা হয়।
একজন স্বজনহারা পিতা, যিনি কেবল তাঁর সন্তানের মৃত্যুর বিচার চেয়েছিলেন,
তাঁকে কেন এভাবে অপরাধীর মতো খুঁজতে হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে।


চিরকুটের সেই করুণ আর্তি: ‘মামলা করা কি আমার অপরাধ?’
উসাইমং মারমা তাঁর হাতে লেখা চিঠিতে লিখেছেন—
“আমি এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। তাই জাতির কাছে প্রশ্ন রইল, মামলা করা কি আমার অপরাধ? আপনারা আমার পাশে থাকবেন, আমি এই আশাবাদ প্রত্যাশা রাখি।”
সন্তানের লাশের শোক কাটতে না কাটতেই এই ধরণের রাষ্ট্রীয় হয়রানি কেবল উসাইমং মারমার জন্যই নয়,
বরং দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।
বৈষম্যহীনতার আড়ালে কি নব্য ফ্যাসিজম?
৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ গড়ার যে শ্লোগান দেওয়া হয়েছিল,
উসাইমং মারমার ঘটনাটি তার ঠিক বিপরীত এক বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছে।
- বিচারের দাবিতে বাধা: যখন একজন খুনের মামলার আসামির বিরুদ্ধে মামলা করার কারণে বাদীকে ডিবি পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—মানবাধিকার ও আইনের শাসন কি কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য?
- প্রশাসনের নীরবতা: শিক্ষক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা যারা সামান্য ঘটনায় আসমান কাঁপিয়ে তুলতেন, আজ এক পাহাড়ি বাবার এই আর্তনাদে তাঁরা কেন নীরব?
- মার্কিন সংশ্লিষ্টতা ও ভূ-রাজনীতি: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, মার্কিন মদতপুষ্ট প্রশাসনকে সুরক্ষা দিতেই বিচারপ্রার্থীদের কণ্ঠ রোধ করার এই চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তারেক রহমান ও ড. ইউনূসের সরকারের এই কর্মকাণ্ডকে অনেকেই ‘নব্য ফ্যাসিজম’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
মাইলস্টোন স্কুল ট্র্যাজেডি: এক অবিস্মরণীয় ক্ষত
২০২৫ সালের ২১ জুলাই দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর বিমান বিধ্বস্ত হয়ে যে ৩৬ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে উক্য ছাইং মারমা ছিল অন্যতম।
২৮ জন শিক্ষার্থীর সেই অকাল মৃত্যু পুরো জাতিকে কাঁদিয়েছিল। উসাইমং মারমা চেয়েছিলেন সেই ঘটনার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে।
কিন্তু ক্ষমতার দাপটে সেই দাবি আজ ডিবির অভিযানের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
মানবতা কি তবে কেবলই শ্লোগান?
উসাইমং মারমার নিরাপত্তা আজ এক বিশাল প্রশ্নের মুখে।
যদি বিচার চাইতে গিয়ে গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়, তবে সেই রাষ্ট্রকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক বলা চলে না।
সময় এসেছে এই জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর।
ইউনুস-তারেক-জামাত গংদের এই সম্মিলিত ব্যবস্থার অধীনে বিচারপ্রার্থীদের ওপর যে নির্যাতন চলছে,
তার অবসান না হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এক অন্ধকার গহ্বরে পতিত হবে।
উসাইমং মারমা বিচার চেয়েছিলেন, প্রতিহিংসা নয়।
আজ তাঁর পাশে দাঁড়ানো কেবল একটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানো নয়, বরং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো।
