সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হঠাৎ হাজার হাজার পাকিস্তানি শ্রমিকের বহিষ্কার। ইরান-মার্কিন দ্বন্দ্বে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও আমিরাতের ক্ষোভের রোষানলে ইসলামাবাদ?
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে এক বিশাল ধস নেমেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হঠাৎ করেই হাজার হাজার পাকিস্তানি শ্রমিককে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বহিষ্কার করা হচ্ছে। সোমবার (১১ মে) মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই সংকটের ভয়াবহ চিত্র। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের অতি-উৎসাহী ‘মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা’ পালন করতে গিয়ে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র আবুধাবির সাথে বড় ধরণের কূটনৈতিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে ইসলামাবাদ। এর সরাসরি খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মেহনতি মানুষদের।
মধ্যস্থতার বিষফল: যখন মিত্রই হয় শত্রু
গত ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। পাকিস্তান এই শান্তি প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করলেও, আবুধাবি বিষয়টিকে দেখছে ভিন্ন চোখে। যুদ্ধের সময় আমিরাত যখন শত শত ইরানি মিসাইল ও ড্রোন হামলার শিকার হচ্ছিল, তখন পাকিস্তানের ‘নমনীয়’ অবস্থান আমিরাত কর্তৃপক্ষকে ক্ষুব্ধ করেছে। আবুধাবির অভিযোগ, পাকিস্তান তাদের সাথে পর্যাপ্ত সমন্বয় না করেই এই শান্তি উদ্যোগ শুরু করেছিল।
টার্গেট কি কেবল ‘শিয়াপন্থী’ কর্মীরা?
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এক চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে।
গত এক মাসে আমিরাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার পাকিস্তানি শিয়া কর্মীকে আটক ও পরে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
- আলী হামজার অভিজ্ঞতা: ২৫ বছর বয়সী এই যুবক জানান, অফিস থেকে সরাসরি তুলে নিয়ে তাকে আটক কেন্দ্রে রাখা হয় এবং কোনো মালামাল গোছানোর সুযোগ না দিয়েই পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
- হায়দার আলী বঙ্গশের আর্তনাদ: ট্যাক্সিচালক হায়দার আলী বলেন, “তারা আমাদের কোনো কারণ বলেনি, কিন্তু আমরা বুঝতে পেরেছি আমাদের অপরাধ—আমরা শিয়া।” যদিও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নির্দিষ্ট বৈষম্যের বিষয়টি অস্বীকার করেছে, তবে বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে।
আর্থিক খড়গ: ঋণের টাকা ফেরত চাইছে আমিরাত
কূটনৈতিক টানাপোড়েন কেবল শ্রমবাজারেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন আর্থিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
গত মাসে আমিরাত পাকিস্তানের কাছে থাকা তাদের ৩৫০ কোটি ডলারের লোন তাৎক্ষণিক ফেরত চেয়েছে।
এই অর্থ পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
যদিও এই চরম সংকটে সৌদি আরব ৩০০ কোটি ডলার জমা রাখার প্রস্তাব দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে, তবে আমিরাতের এই ‘পাওনা আদায়ের’ কড়া বার্তা ইসলামাবাদের জন্য এক বড় ধরণের সংকেত।
রিজভী ও হাক্কানির বিশ্লেষণ: কেন এই অবাক হওয়া?
আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাকাডেমির হুসেইন হাক্কানি এই পরিস্থিতিকে মজার ছলে বিশ্লেষণ করে বলেছেন, “আমিরাত অবাক হয়েছে যে পাকিস্তান তাদের সমর্থন দেয়নি, আর পাকিস্তান অবাক হয়েছে এটা দেখে যে আমিরাত কেন অবাক হলো!” অর্থাৎ, দুই দেশের মধ্যে আস্থার যে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট।
শ্রমবাজারের স্থবিরতা ও ভিসা জটিলতা
আমিরাতের অন্তত ১২টি বড় প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজাররা জানিয়েছেন, ইমিগ্রেশন বিভাগ থেকে স্পষ্টভাবে পাকিস্তানি কর্মীদের ভিসা নবায়ন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এমনকি নতুন ভিসা ইস্যু করাও স্থগিত রাখা হয়েছে।
- রেমিট্যান্সের ধাক্কা: গত বছর আমিরাতে থাকা ২০ লাখ পাকিস্তানি প্রায় ৮০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন। এই শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেলে পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে বড় ধরণের ধস নামবে।
সৌদি-আমিরাত প্রতিযোগিতার মাঝে পাকিস্তান
বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান এখন একদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যদিকে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান দূরত্বের মাঝে আটকা পড়েছে।
ইয়েমেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে বিভেদ বাড়ছে।
এর মধ্যে পাকিস্তান গত বছর সৌদির সঙ্গে একটি বিশেষ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, যা আমিরাতকে আরও বেশি কোণঠাসা অনুভব করিয়েছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, পাকিস্তানের এই ‘একাধিক নৌকায় পা রাখা’র নীতিই এখন বুমেরাং হয়ে দেখা দিচ্ছে।
সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ কোথায়?
রাষ্ট্রের নীতি আর কূটনৈতিক মারপ্যাঁচে সবসময় বলি হয় সাধারণ মানুষ।
২৫ বছর ধরে আমিরাতে কাজ করা ব্যক্তিকেও কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে।
পাকিস্তানের সাবেক অর্থমন্ত্রী মিফতাহ ইসমাইল সঠিকভাবেই বলেছেন,
আমিরাতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে পাকিস্তান হয়তো নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে।
