দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে হারভেস্টার মেশিনে চাঁদাবাজির অভিযোগে ছাত্রদলের দুই নেতা বহিষ্কৃত। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিরুদ্ধে কড়া সাংগঠনিক অ্যাকশন।
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় বোরো ধান কাটার আধুনিক যন্ত্র (কম্বাইন হারভেস্টার) থেকে অবৈধ অর্থ দাবির অভিযোগে বড় ধরনের সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। কৃষকের ধান কাটার মেশিনে বাধা প্রদান এবং অর্থ আদায়ের চেষ্টার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলায় স্থানীয় দুই ছাত্রদল নেতাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। শনিবার (১৬ মে) দুপুরে উপজেলা ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা প্রকাশ্যে আনে। ঘটনাটি স্থানীয় কৃষক এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
যাদের বিরুদ্ধে এলো সাংগঠনিক চাবুক
দলীয় শৃঙ্খলা ও আদর্শ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার দায়ে যে দুই নেতার বিরুদ্ধে এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তারা হলেন:
- ইকবাল হোসেন: তিনি নবাবগঞ্জ উপজেলার শালখুরিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রত্যাশী ছিলেন।
- আলমগীর হোসেন জয়: তিনি একই ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ছিলেন।
উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মুক্তাদির হোসেন বকুল এবং সদস্যসচিব মুক্তি মাহফুজ যৌথ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেন,
সংগঠনের নীতি ও আদর্শের বাইরে গিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় তাদের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব ধরনের দলীয় পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হলো।
সংগঠনের কড়া বার্তা: বহিষ্কৃত এই দুই নেতার কোনো অপকর্মের দায় দল নেবে না। একই সঙ্গে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—দলের কোনো স্তরের নেতাকর্মী যেন তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সাংগঠনিক যোগাযোগ বা সম্পর্ক না রাখেন, সেই নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
নেপথ্যের ঘটনা: যেভাবে চললো ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের খেলা
চলতি বোরো মৌসুমে কৃষকদের ঘরে ধান তোলার ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে।
শ্রমিক সংকটের এই সময়ে যান্ত্রিক উপায়ে দ্রুত ধান কাটতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হারভেস্টার মেশিন ভাড়া নিচ্ছেন কৃষকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে,
গত শুক্রবার রাতে নবাবগঞ্জের শালখুরিয়া ইউনিয়নের বড় তেঁতুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা আল আমিন নিজের খেতের বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ের সুবিধার্থে একটি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন ভাড়া করে এলাকায় নিয়ে আসেন।
মেশিনটি গ্রামে পৌঁছানোর পরপরই সেখানে হাজির হন ছাত্রদল নেতা ইকবাল ও আলমগীর।
তারা মেশিনের মালিক ও ভাড়াটে কৃষককে বিভিন্ন ধরনের আইনি জটিলতার ভয় দেখাতে শুরু করেন।
একপর্যায়ে ‘পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দিয়ে নগদ ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।
সাধারণ কৃষক ও মেশিনের চালক এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
পরবর্তীতে এই চাঁদাবাজির বিষয়টি ওই রাতেই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের সিনিয়র নেতাদের নজরে আসে।
তদন্তে সত্যতা: যা বললেন ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব
বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন নবাবগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মুক্তি মাহফুজ।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, বর্তমান সময়ে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “কৃষকের ধান কাটার মেশিনে গিয়ে অর্থ দাবি করার বিষয়টি জানার পরপরই আমরা অভ্যন্তরীণভাবে একটি প্রাথমিক তদন্ত চালাই।
তদন্তে ওই দুই পদপ্রত্যাশী নেতার বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজির অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।
যেহেতু ছাত্রদল সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার রাজনীতি করে, তাই কোনো অপরাধীকে দলে আশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই।
দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাদের তাৎক্ষণিক বহিষ্কার করা হয়েছে।”
আইনি পদক্ষেপ ও পুলিশের বক্তব্য
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ডেভিড হিমাদ্রি বর্মন জানান,
ধানকাটা মেশিনের মালিকের কাছ থেকে টাকা দাবি করার বিষয়টি মৌখিকভাবে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে পুলিশ জানতে পেরেছে।
তবে এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী মেশিনের মালিক বা স্থানীয় কোনো কৃষক থানায় এসে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেননি।
লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে পুলিশ আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
গুগল অ্যাডসেন্স ফ্রেন্ডলি বিশ্লেষণ: কৃষিখাতে চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আর মে ও জুন মাস হচ্ছে কৃষকদের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে ধানকাটা যন্ত্রের ওপর চাঁদাবাজি সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রান্তিক কৃষকদের ওপর আঘাতের শামিল।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোনো কোনো মহলে ক্ষমতার অপব্যবহারের চেষ্টা দেখা গেলেও, নবাবগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদল যেভাবে দ্রুততম সময়ে নিজেদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, তা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। এই ধরনের তাৎক্ষণিক একশন অপরাধ প্রবণতা কমাতে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
স্থানীয় কৃষকদের প্রতিক্রিয়া
বড় তেঁতুলিয়া গ্রামের সাধারণ চাষিরা জানান, শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো ধান ঘরে তোলা নিয়ে তারা সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকেন। হারভেস্টার মেশিনের কারণে অল্প খরচে ও কম সময়ে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক পরিচয়ে চাঁদা দাবি করা অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে দল থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় কৃষকরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং নির্বিঘ্নে ধান কাটার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
