‘অপারেশন সিন্দুর’-এর বর্ষপূর্তিতে পাক ভূখণ্ড নিয়ে জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর নজিরবিহীন মন্তব্য। দক্ষিণ এশিয়ায় দুই পরমাণু শক্তির নতুন যুদ্ধ উত্তেজনা।
আন্তর্জাতিক ও সামরিক ডেস্ক | ঢাকা ১৭ মে, ২০২৬;
দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরমাণু অস্ত্রধারী প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার শীতল সম্পর্ক এখন যেকোনো মুহূর্তের অগ্নিগর্ভ রূপ নেওয়ার উপক্রমে দাঁড়িয়েছে। দুই দেশের বৈরিতার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে কঠোর এবং ধ্বংসাত্মক সামরিক হুঁশিয়ারিটি এসেছে দিল্লির সর্বোচ্চ সামরিক মহল থেকে। ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী স্পষ্ট ভাষায় ইসলামাবাদকে সতর্ক করে বলেছেন, পাকিস্তান যদি অনতিবিলম্বে তাদের মাটিতে সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয় দেওয়া এবং ভারতের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন অপতৎপরতা চালানো বন্ধ না করে, তবে তারা ভবিষ্যতে বিশ্বের মানচিত্রে থাকবে নাকি ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে, তা তাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এই মন্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে পারমাণবিক যুদ্ধের নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে।
মানেকশ সেন্টারের সেই বিস্ফোরক অধিবেশন: ‘সেনা সংবাদ’
গত শনিবার (১৬ মে, ২০২৬) নয়াদিল্লির বিখ্যাত মানেকশ সেন্টারে ‘ইউনিফর্ম আনভেইল্ড’ নামক একটি প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে ‘সেনা সংবাদ’ শীর্ষক একটি বিশেষ ইন্টারেক্টিভ অধিবেশনের আয়োজন করা হয়।
উক্ত অনুষ্ঠানে ভারতের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, রণকৌশলবিদ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সেই মঞ্চে দাঁড়িয়েই জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের দীর্ঘদিনের ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
তবে তার এবারের বার্তার তীক্ষ্ণতা এবং ভাষা ছিল প্রথাগত কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সম্পূর্ণ বাইরে, যা সরাসরি একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ওপর প্রশ্ন তোলে।
‘অপারেশন সিন্দুর’ এবং ৮৮ ঘণ্টার সেই পরমাণু উত্তেজনা
অনুষ্ঠানে ভারতীয় সেনাপ্রধানের কাছে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছিল,
গত বছর সংঘটিত ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর মতো পরিস্থিতি যদি সীমান্তে আবার তৈরি হয়, তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী তার কেমন জবাব দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে জেনারেল দ্বিবেদী গত বছরের সেই ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেন।
মূলত, ২০২৫ সালের মে মাসের শুরুতে কাশ্মীরের পাহালগামে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিরা একটি প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলা চালায়।
এর জবাবে গত বছরের ৭ মে ভোরে ভারতীয় সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ড এবং পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) অবস্থিত একাধিক সন্ত্রাসী আস্তানা লক্ষ্য করে একযোগে নিখুঁত বিমান ও সামরিক হামলা (Precision Strike) চালায়।
সামরিক ইতিহাসে এটিই ‘অপারেশন সিন্দুর’ নামে পরিচিত।
সেই সংঘাতের প্রধান দিকগুলো:
- পাল্টা আক্রমণ: ভারতের সেই আকস্মিক হামলার পর পাকিস্তানও পাল্টা সামরিক বিমান হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিল।
- ৮৮ ঘণ্টার যুদ্ধ: দুই দেশের পরবর্তী কাউন্টার-অফেনসিভ বা প্রতিরোধমূলক সামরিক অভিযানগুলো টানা ৮৮ ঘণ্টা ধরে চলেছিল, যা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় পূর্ণাঙ্গ পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছিল।
- গোপন যুদ্ধবিরতি: পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক তীব্র কূটনৈতিক চাপের মুখে ১০ মে সন্ধ্যায় একটি গোপন ও পারস্পরিক যুদ্ধবিরতি সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
ভূগোলের অংশ না কি ইতিহাসের বিলীন?
গত বছরের সেই ১০ মে-র যুদ্ধবিরতির পর ঠিক এক বছর পূর্ণ হতেই ভারতীয় সেনাপ্রধানের এই নতুন হুমকি প্রমাণ করে যে,
দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত উত্তেজনা ভেতরের দিকে কতটা ফুটছে।
প্রশ্নের জবাবে জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী তার পূর্ববর্তী অবস্থানের অনড়তা প্রকাশ করে বলেন:
“আপনারা যদি আগে আমার বক্তব্য শুনে থাকেন, তবে জানেন আমি কী বলেছিলাম… পাকিস্তান যদি ক্রমাগত সন্ত্রাসবাদীদের লালন-পালন করতে থাকে এবং ভারতের ক্ষতি করার চেষ্টা চালিয়ে যায়, তবে তাদেরই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা নিজেদের ভূগোলের অংশ হিসেবে টিকিয়ে রাখবে নাকি ইতিহাসের পাতায় বিলীন করে দেবে।”
কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক সমীকরণ
এই বিস্ফোরক মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন পাকিস্তান সামরিক ক্ষেত্রে চীনের পাশাপাশি বাংলাদেশের সাথেও নতুন করে অক্ষ তৈরির চেষ্টা করছে।
দিল্লির সামরিক নীতিনির্ধারকরা পাকিস্তানের এই চারপাশের ঘেরাটোপ তৈরি এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় করিডোরে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টাকে ভালোভাবে নিচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জেনারেল দ্বিবেদীর এই বার্তা কেবল পাকিস্তানের জন্য নয়,
বরং এই অঞ্চলে ইসলামাবাদের পেছনে থাকা অদৃশ্য শক্তি বেইজিংয়ের জন্যও একটি পরোক্ষ সংকেত।
ভারত যে কোনো ধরণের প্রক্সি-ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধের জবাবে সরাসরি মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে দ্বিধা করবে না, এই বার্তার মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা হলো।
শান্তির সুতো কি ছিঁড়ে যাচ্ছে?
পারমাণবিক অস্ত্রশাস্ত্রে ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধ তত্ত্বের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
ভারতীয় সেনাপ্রধানের এই সংক্ষিপ্ত অথচ তীক্ষ্ণ মন্তব্যকে পাকিস্তানের ওপর এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে, দুই পারমাণবিক শক্তির এই চরম বাকযুদ্ধ যেকোনো ছোট ভুল বোঝাবুঝির কারণে বড় সংঘাতের রূপ নিতে পারে।
বিশ্ব সম্প্রদায় এখন গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার এই দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত বিবাদ শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে মেটে,
নাকি আসলেই কোনো মানচিত্র পরিবর্তনের ট্র্যাজেডির দিকে ধাবিত হয়।
