বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে ইতিহাসের নতুন বিন্যাস নিয়ে বিতর্ক ও কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা। জেনে নিন ৫২, ৭১ ও ২৪-এর ইতিহাস কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে।
বিশেষ প্রতিবেদন, ঢাকা: ১৮ মে, বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘বিভক্ত বিশ্বের সেতুবন্ধে জাদুঘর’ হলেও, বাংলাদেশের প্রধানতম ঐতিহাসিক স্মারক সংগ্রহশালা—বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক নতুন বিতর্ক। সম্প্রতি দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ উঠেছে, জাদুঘরের প্রদর্শনী থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মারক সংকুচিত বা অপসারণ করা হয়েছে। তবে জাদুঘর প্রশাসন এই অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে। তাদের দাবি, এটি কোনো ইতিহাস বিকৃতি বা মুছে ফেলার চেষ্টা নয়; বরং ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সামগ্রিক ইতিহাসকে একটি সুসংহত ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক কাঠামোর আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।
দর্শনার্থীদের চোখে ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি: কোথায় গেলেন মহানায়ক?
সম্প্রতি রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত এই চারতলা ভবনের গ্যালারিগুলো ঘুরে সাধারণ দর্শনার্থীদের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও অসন্তোষ দেখা গেছে।
বিশেষ করে ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের কর্নার পরিদর্শনে এসে অনেকেই হতাশ হয়েছেন।
যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে সপরিবারে আসা দর্শনার্থী রায়হান কবীর নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে বলেন:
“আমি আমার সন্তানদের আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতার ইতিহাস দেখাতে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পূর্বে যে বিশাল ডেডিকেটেড গ্যালারি বা আলাদা কর্নার ছিল, তা এখন আর নেই। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার একটি ছোট ছবি ছাড়া ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা কিংবা ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তার একক নেতৃত্বের কোনো দৃশ্যমান দলিল বা আলোকচিত্র চোখে পড়েনি। মনে হচ্ছে ইতিহাসের একটি বড় অংশকে আড়াল করার সুক্ষ্ম চেষ্টা চলছে।”
একই সুর শোনা গেল মিরপুরের বাসিন্দা শাহনাজ পারভিন মিলা এবং নওগাঁ থেকে আসা প্রবীণ দর্শনার্থী খাজামাত উদ্দিনের কণ্ঠে।
তারা জানান, জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গ্যালারিগুলো সমৃদ্ধ হলেও মুক্তিযুদ্ধের মূল কাণ্ডারির ইতিহাস যেভাবে থাকার কথা ছিল, বর্তমান বিন্যাসে তার ঘাটতি স্পষ্ট।
এমনকি জাদুঘরের গ্রন্থাগারেও মুক্তিযুদ্ধ কর্নারের বইপত্রের সংখ্যা আগের চেয়ে সীমিত মনে হয়েছে বলে অনেকে অভিযোগ করেন।
কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা: ‘অপসারণ নয়, সুরক্ষার স্বার্থে সাময়িক স্থানান্তর’
দর্শনার্থীদের এই ক্ষোভ ও প্রশ্নের বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে জাদুঘর প্রশাসন।
তাদের মতে, যেকোনো ঐতিহাসিক স্মারক রক্ষা করা জাদুঘরের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব, তা ধ্বংস করার সুযোগ কারো নেই।
জাতীয় জাদুঘরের কিপার ও পাবলিক এডুকেশন বিভাগের প্রধান আসমা ফেরদৌসী এ প্রসঙ্গে বলেন, “বঙ্গবন্ধু কর্নারের কিছু স্মারক ও প্রতিকৃতি সরানো হয়েছে—এটি সত্য।
তবে এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। গত বছরের চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সময় জাদুঘরে বড় ধরনের হামলা বা ভাঙচুরের প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
জাতীয় সম্পদ ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো সুরক্ষিত রাখতেই কিছু জিনিস সাময়িকভাবে নিরাপদ স্টোরেজে সরিয়ে নেওয়া হয়।”
তিনি আরও যোগ করেন, জাদুঘরের নিয়ম অনুযায়ী আজকে যা কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে, কাল তা গবেষণার খাতিরে অনন্য হয়ে উঠতে পারে।
তাই কোনো কিছু নষ্ট বা স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত করার কোনো এখতিয়ার কর্তৃপক্ষের নেই।
নতুন আঙ্গিকে ইতিহাস: ৫২, ৭১ ও ২৪-এর ত্রিমাত্রিক সমন্বয়
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বর্তমান মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব ইতিহাসের এই নতুন বিন্যাসকে দেখছেন একটি বৈজ্ঞানিক ও পক্ষপাতহীন রূপান্তর হিসেবে।
তিনি স্পষ্ট করেন যে, ইতিহাসকে কোনো একক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, বরং একটি ধারাবাহিক ও গবেষণাভিত্তিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপন করা হবে।
মহাপরিচালক জানান:
১৯৭১-এর ভূমিকা: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের যে ঐতিহাসিক অবদান, তা ইতিহাসে তার যথাযথ মর্যাদাতেই থাকবে।
পরবর্তী ইতিহাস: ১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনকেও জাদুঘরে স্থান দেওয়া জরুরি।
তিনটি প্রধান স্তম্ভ: বাংলাদেশের ইতিহাস এখন মূলত তিনটি প্রধান মাইলফলকের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হবে,
১৯৫২ (ভাষা আন্দোলন), ১৯৭১ (স্বাধিকার ও মুক্তিযুদ্ধ) এবং ২০২৪ (সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান)।
এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় জাদুঘরের ১৭ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের অধীনে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই কমিটিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইতিহাসবিদ, গবেষক ও তাত্ত্বিকরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, যারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে ইতিহাসের একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করছেন।
ডিজিটাল যুগের জাদুঘর: দেয়ালচিত্র ছাড়িয়ে ইন্টারঅ্যাক্টিভ অভিজ্ঞতা
তানজিম ওয়াহাব আরও জানান, আধুনিক যুগের তরুণ প্রজন্ম শুধু দেয়ালে ঝোলানো স্থিরচিত্র বা নিচে লেখা ছোট ক্যাপশন পড়ে ইতিহাস জানতে চায় না।
তারা ইতিহাসকে অনুভব করতে চায়।
সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে জাতীয় জাদুঘরকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও প্রযুক্তিবান্ধব করার রূপরেখা নেওয়া হয়েছে:
ডিজিটাল স্টোরিটেলিং: শুধু স্মারক প্রদর্শন নয়, অডিও গাইড এবং ত্রিমাত্রিক ভিডিওর মাধ্যমে ইতিহাসের গল্প বলা হবে।
স্মার্ট শিক্ষণ পদ্ধতি: প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে ‘বিশেষ শিশু দিবস’।
শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা এসে শিশুবান্ধব গাইডের মাধ্যমে আনন্দময় পরিবেশে ইতিহাস শিখবে।
গবেষণাভিত্তিক প্রদর্শনী: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাস ক্রমানুসারে সাজানো হবে,
যেন কোনো দর্শক বিভ্রান্ত না হন।
বড় সংকট আবাসন: ৯৫ শতাংশ নিদর্শনই অন্ধকক্ষে বন্দী
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম এই জাদুঘরের একটি বড় সংকট হলো জায়গার অভাব।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে বর্তমানে নিবন্ধিত ঐতিহাসিক নিদর্শনের সংখ্যা প্রায় ৯৩,২৪৬টি।
অথচ চারতলা বিশিষ্ট মূল ভবনের ৪৬টি গ্যালারিতে প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ৪,১৭৮টি নিদর্শন।
| বিবরণ | সংখ্যা / তথ্য |
| মোট নিবন্ধিত স্মারক | ৯৩,২৪৬টি |
| প্রদর্শিত নিদর্শন | ৪,১৭৮টি (মাত্র ৫%) |
| স্টোরেজে সংরক্ষিত | প্রায় ৮৯,০৬৮টি (৯৫%) |
| বিগত ৫ বছরে শিক্ষার্থী পরিদর্শকের সংখ্যা | প্রায় ৫ লাখ (বিনামূল্যে) |
| ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পেইড দর্শনার্থী | ৩১,৪১১ জন |
এই আবাসন সংকট দূর করতে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বর্তমান মূল ভবন সংস্কারের পাশাপাশি একটি অত্যাধুনিক ১০ তলা বিশিষ্ট নতুন অ্যানেক্স ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
এই নতুন ভবনটি নির্মিত হলে সমকালীন শিল্পকলা, বিশেষায়িত প্রদর্শনী এবং স্টোরে থাকা বাকি ৯৫ শতাংশ নিদর্শনের একটি বড় অংশ সাধারণ মানুষের সামনে উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে।
দর্শনার্থী হ্রাস ও মাঠপর্যায়ের স্থবিরতা
জাদুঘরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথে কথা বলে জানা গেছে,
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও জুলাই আন্দোলনের পর থেকে সাধারণ দর্শনার্থীদের সমাগম কিছুটা কমেছে।
আগে যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষের ভিড় থাকত, এখন সেই তুলনায় সংখ্যাটি কম।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী জানান, পূর্বে জাদুঘরের বিশেষ টিম দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাঠপর্যায়ে গিয়ে ঐতিহাসিক নিদর্শন সংগ্রহ করত।
তহবিল ও অভ্যন্তরীণ নীতিমালার কারণে বর্তমানে সেই মাঠপর্যায়ের সংগ্রাহক কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে, যা দ্রুত সচল করা প্রয়োজন।
আসছে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’: ৫ আগস্ট উদ্বোধনের টার্গেট
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও শহীদদের অবদান ধরে রাখতে সরকার একটি স্বাধীন ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে চলছে।
জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক জানান, আগামী ৫ আগস্টের মধ্যেই এই বিশেষ জাদুঘরটি উদ্বোধনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে। যেহেতু জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় একটি টার্নিং পয়েন্ট, তাই মূল জাতীয় জাদুঘরেও একটি বিশেষ ‘জুলাই কর্নার’ স্থাপন করা হবে, যা ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।
আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের বর্ণাঢ্য আয়োজন
ঐতিহাসিক বিতর্কের এই আবহের মাঝেই আজ ১৮ মে জাতীয় জাদুঘরে দিনব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। সকাল ১০টায় একটি বর্ণাঢ্য র্যালির মাধ্যমে দিবসের সূচনা ঘটে। এরপর বিশেষ প্রদর্শনীর উদ্বোধন, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি-র। জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাবের সভাপতিত্বে এই সেমিনারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং জাদুঘর পর্ষদের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা অংশ নেবেন।
ঐতিহাসিকদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন যাই হোক না কেন, জাতীয় জাদুঘরের মতো সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ইতিহাসের উপস্থাপন যেন কোনোভাবেই দলকানা বা একপেশে না হয়। ৫২, ৭১ কিংবা ২৪—প্রতিটি অধ্যায়ই এ দেশের মানুষের রক্তে লেখা, আর তার প্রতিটি বিন্দুর সঠিক সংরক্ষণই হোক এই আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের মূল অঙ্গীকার।
