বগুড়ার ফুলবাড়ীতে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার পর আসামিদের ধরতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। বিস্তারিত পড়ুন।
উত্তরের ঐতিহ্যবাহী জেলা শহর বগুড়ায় এক তরুণীকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের এক রোমহর্ষক ও নৃশংস ঘটনা সামনে এসেছে। এই অপরাধের সাথে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে তিন অভিযুক্ত তরুণকে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছে। রোববার (১৭ মে) দিবাগত রাতে শহরের ফুলবাড়ী ফাঁড়ি পুলিশ ও সদর থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই পৈশাচিক ঘটনার শিকার ওই তরুণী নিজেই বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার এজাহারভুক্ত বাকি আসামিদের ধরতেও চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও মামলার সত্যতা
আলোড়িত এই অপরাধের বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছেন বগুড়া সদর থানার সেকেন্ড অফিসার ও উপপরিদর্শক (এসআই) জিয়াউর রহমান।
তিনি সাংবাদিকদের জানান, অপরাধের শিকার তরুণীর লিখিত অভিযোগ ও এজাহারের ওপর ভিত্তি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা রুজু করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন:
“আমরা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশি তৎপরতা শুরু হয় এবং রাতেই প্রধান তিন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। এই ঘটনার পেছনে অন্য কারও প্ররোচনা বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
শপিংমল থেকে নির্মাণাধীন ভবন: ঘটনার নেপথ্যে যা ছিল
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও মামলার এজাহার থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ভুক্তভোগী তরুণীর সাথে গ্রেপ্তারকৃত ও অভিযুক্ত তরুণদের পূর্ব জানাশোনা ছিল।
তাদের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক সখ্য বা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
রোববার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে ওই তরুণী কেনাকাটার উদ্দেশ্যে বগুড়া শহরের একটি নামকরা শপিংমলে যান। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিল পরিচিত ওই তরুণরা।
শপিংমলে সাধারণ আলাপচারিতার একপর্যায়ে অভিযুক্তরা কৌশলে ওই তরুণীকে শহরের শ্মশানঘাট সংলগ্ন একটি নির্জন ও নির্মাণাধীন ভবনের দিকে নিয়ে যায়।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, সেখানে পৌঁছানোর পর পূর্বপরিকল্পিতভাবে আরও এক তরুণ এসে তাদের সাথে যোগ দেয়।
নির্জন পরিবেশের সুযোগ নিয়ে তারা সবাই মিলে তরুণীর ওপর পাশবিক নির্যাতন ও দলবদ্ধ ধর্ষণ চালায়।
সাহসী চিৎকার ও স্থানীয়দের উদ্ধার অভিযান
পাশবিকতার এখানেই শেষ নয়। নির্যাতনের পর রাত গভীর হলে অভিযুক্তরা তরুণীকে শহরের মূল সড়কের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, যেন কেউ সন্দেহ না করতে পারে।
কিন্তু সেই চরম বিপদের মুহূর্তেও ভুক্তভোগী তরুণী সাহসিকতার পরিচয় দেন।
শহরের কাছাকাছি পৌঁছানো মাত্রই তিনি চিৎকার করে আসেপাশের মানুষের সাহায্য প্রার্থনা করেন।
গভীর রাতে তরুণীর আর্তচিৎকার শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং জনরোষের ভয়ে অভিযুক্তরা তরুণীকে রাস্তায় ফেলেই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দ্রুত চম্পট দেয়।
পরবর্তীতে উপস্থিত সচেতন নাগরিকরা ভুক্তভোগীকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করেন।
পুলিশের ত্বরিত পদক্ষেপ ও চিকিৎসা সহায়তা
খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ফুলবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) আনাহার হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়।
তারা ভুক্তভোগী তরুণীকে উদ্ধার করে মানসিক ট্রমা থেকে কাটিয়ে উঠতে আশ্বস্ত করেন।
পুলিশি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় রাতেই তাকে দ্রুত বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করা হয়।
সেখানে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) তার প্রয়োজনীয় ডাক্তারি পরীক্ষা ও চিকিৎসা চলছে।
ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পেলে আদালতের মাধ্যমে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া আরও জোরালো হবে বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।
এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
বগুড়া শহরের ফুলবাড়ী ও শ্মশানঘাট এলাকায় এই ধরনের জঘন্য অপরাধের ঘটনায় স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
সচেতন মহল মনে করছেন, শহরের ভেতরে নির্মাণাধীন বা পরিত্যক্ত ভবনগুলো অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে।
স্থানীয় এক সমাজকর্মী বলেন, “আমাদের শহরের বুকে এমন ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না।
সখ্যতার সুযোগ নিয়ে যারা এই ধরনের জঘন্য কাজ করেছে, তাদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন দুঃসাহস না দেখায়।
পাশাপাশি পুলিশি টহল আরও জোরদার করা প্রয়োজন।”
বগুড়া সদর থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে সোপর্দ করা হবে।
মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এবং ঘটনার সাথে অন্য কারো ইন্ধন ছিল কি না তা নিশ্চিত হতে পুলিশ আদালতে রিমান্ড আবেদন করতে পারে।
একই সাথে পলাতক বাকি আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, খুব দ্রুতই এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হবে যাতে ভুক্তভোগী পরিবারটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে ন্যায়বিচার পায়।
