সীতাকুণ্ডে ছাত্রলীগ কর্মী জিলহানের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সহিংসতার নেপথ্য ও বিরোধী জোটের নীরবতার কারণ জানুন।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া এক লোমহর্ষক ও বর্বরোচিত রাজনৈতিক সহিংসতা দেশের বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের স্থানীয় কর্মী জিলহানের ওপর যেভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ চালানো হয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, আহতের শরীরে কোপানোর আঘাত এতটাই গভীর এবং অসংখ্য ছিল যে, প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সেলাই দেওয়া কিংবা জরুরি ইনজেকশন পুশ করার মতো ন্যূনতম অক্ষত স্থানও অবশিষ্ট ছিল না।
এই চরম অমানবিক ও নৃশংস ঘটনার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও, একটি বিশেষ মহলের নীরবতা সচেতন মহলকে গভীরভাবে বিস্মিত করেছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াত ইসলামী—উভয় পক্ষের কেউই এই পৈশাচিক হামলার নিন্দায় একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন,
প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনের ওপর এ ধরনের প্রাণঘাতী হামলাকে নিন্দা জানানোর পরিবর্তে পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এক নোংরা সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে।
ইতিহাসের দায় এবং সহিংসতার উত্তরাধিকার
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সহিংসতার শিকড় অনেক গভীরে।
সমালোচকদের মতে, দেশের অন্যতম বৃহৎ এই রাজনৈতিক জোটের উৎপত্তি ও বিকাশ গণতান্ত্রিক পন্থায় না হয়ে সেনানিবাসের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে হয়েছিল।
জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যে রাজনৈতিক ধারার সূচনা,
তা বহু বছর ধরে এদেশের ক্যাম্পাস ও রাজনৈতিক ময়দানকে দখলবাজি, অস্ত্রবাজি এবং সন্ত্রাসের কারখানায় রূপান্তরিত করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানের এই নৃশংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি সেই পুরনো খুনের রাজনীতি লালন করার এক ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ।
এই জোটের অন্য শরিক দলটির অতীত ইতিহাসও যুদ্ধাপরাধ ও রক্তপাতের কালিমায় লিপ্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে সীতাকুণ্ডের মাটিতে জিলহানের ওপর চালানো এই পরিকল্পিত হামলা প্রমাণ করে যে,
মাঠপর্যায়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য তারা আবারও সেই চেনা এবং বিপজ্জনক সহিংসতার পথেই হাঁটছে।
ক্যাম্পাস রাজনীতি ও বিরোধী ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা
একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ছাত্ররাজনীতি হওয়ার কথা ছিল মেধা, যুক্তি এবং প্রগতির চর্চাকেন্দ্র।
কিন্তু দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলোর অঙ্গসংগঠন—যেমন ছাত্রদল বা যুবদল—তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,
বহুলাংশেই তারা ক্যাম্পাসে সুস্থ ধারা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। সীতাকুণ্ডের এই পৈশাচিক ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে:
যারা নিজেদের প্রগতিশীল ও অধিকারকামী বলে দাবি করে, তারা কেন এই ধরনের নির্মমতার বিরুদ্ধে কোনো জোরালো অবস্থান নিতে পারল না?
- সহিংসতার প্রতীক: মাঠপর্যায়ের কর্মীদের একাংশের মধ্যে সহিংসতাকে বীরত্ব হিসেবে দেখার এক বিকৃত মানসিকতা তৈরি হয়েছে।
- নীরবতার কৌশল: প্রতিপক্ষের ওপর হামলা হলে তা নিয়ে নীরব থাকা অথবা ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে মোড় নেওয়ার চেষ্টা করা।
- রাজনৈতিক ফায়দা: মানবতাকে বিসর্জন দিয়ে কেবল ভোটের রাজনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ক্ষয়ে যাওয়া এবং পচনশীল রাজনৈতিক ধারা থেকেই এসব উগ্রপন্থী গোষ্ঠী তাদের বেঁচে থাকার শক্তি বা তথাকথিত ‘অক্সিজেন’ সংগ্রহ করে থাকে।
ফলে, সুস্থ ও নিরাপদ ক্যাম্পাস বা সমাজ বিনির্মাণ তাদের মূল লক্ষ্য থাকে না।
শেষ কথা
সীতাকুণ্ডের এই ঘটনা কেবল একটি স্থানীয় অপরাধ নয়, এটি দেশের চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক গভীর ক্ষতকে নির্দেশ করে।
ক্ষমতার লোভে মানবতাকে বিসর্জন দেওয়ার এই খেলা বন্ধ না হলে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা চিরতরে বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যেকোনো ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে দলমতনির্বিশেষে কঠোর আইনি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
