ভারতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ ও পুশব্যাক নিয়ে বিজেপি ও ইউপিএ সরকারের আসল পরিসংখ্যান। চন্দন নন্দীর বিস্ফোরক প্রতিবেদনের আলোকে এক বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ” শব্দটি দীর্ঘকাল ধরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) গত এক দশকে এই বিষয়টিকে তাদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব পরিসংখ্যান এবং নর্থইস্ট নিউজ-এ প্রকাশিত প্রখ্যাত সাংবাদিক চন্দন নন্দীর সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং চমকপ্রদ এক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
জনসভায় কড়া বক্তব্য, উসকানিমূলক রাজনৈতিক বিবৃতি এবং কড়া জাতীয়তাবাদের স্লোগানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল সত্যটি হলো—কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (ইউপিএ) সরকারের তুলনায় বর্তমান এনডিএ আমলে সীমান্ত দিয়ে কথিত অনুপ্রবেশকারীদের পুশব্যাক বা ফেরত পাঠানোর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ইউপিএ সরকারের আমলে যত মানুষকে সীমান্ত পার করে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যবর্তী এনডিএ শাসনামলে সেই সংখ্যা প্রায় ২৩ গুণ কম।
সংখ্যার যুদ্ধ: দুই সরকারের আমলের তুলনামূলক খতিয়ান
রাজনৈতিক ময়দানে বাগাড়ম্বর করা যত সহজ, প্রশাসনিক টেবিলে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ততটাই জটিল—এই সত্যটি আরও একবার প্রমাণিত হয় ভারত সরকারের পুশব্যাক সংক্রান্ত পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে। ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ড. মনমোহন সিং-এর নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের আমলে প্রতি বছর গড়ে হাজার হাজার মানুষকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে ফেরত পাঠানো হতো।
নিচে দুই সরকারের আমলের পুশব্যাকের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
ইউপিএ আমলের পুশব্যাক পরিসংখ্যান (২০০৫-২০১৩)
- ২০০৫: ১৪,৯১৬ জন
- ২০০৬: ১৩,৬pipe জন
- ২০০৭: ১২,১৩৫ জন
- ২০০৮: ১২,৬২৫ জন
- ২০০৯: ১০,৬০২ জন
- ২০১০: ৬,২৯০ জন
- ২০১১: ৬,৭৬১ জন
- ২০১২: ৫,২৩৪ জন
এনডিএ আমলের পুশব্যাক পরিসংখ্যান (২০১৪-২০২৪)
- ২০১৪: ৯৮৯ জন
- ২০১৫: ৪৭৪ জন
- ২০১৬: ৩০৮ জন
- ২০১৭: ৫১ জন
- ২০১৮: ৪৪৫ জন
- ২০১৯: ২৯৯ জন
- ২০২০: ২৪৬ জন
- ২০২১: ৫০ জন
- ২০২২: ৪১১ জন
- ২০২৪: ২৯৫ জন
এই দীর্ঘ পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে, মুখে চরম কঠোরতা প্রদর্শন করলেও বাস্তবে এনডিএ সরকারের আমলে সীমান্ত দিয়ে পুশব্যাকের গ্রাফ ক্রমাগত নিচের দিকে নেমেছে। তথ্যের এই বিশাল ব্যবধান প্রমাণ করে যে, অনুপ্রবেশের আখ্যানটি মূলত একটি রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে।
বিজেপির ‘থ্রি-ডি’ নীতি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক খতিয়ান
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মোদী সরকার অনুপ্রবেশ রোধে তিনটি ‘ডি’ (3 Ds) অর্থাৎ—ডিটেকশন (শনাক্তকরণ), ডিলিটেশন (ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া) এবং ডিপোর্টেশন (বিতাড়ন)-এর ওপর ভিত্তি করে একটি কঠোর অভিবাসী-বিরোধী নীতি গ্রহণ করার কথা বলে আসছিল। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে এক আরটিআই (RTI) আবেদনের জবাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে, অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ নাগরিকদের বিতাড়ন করা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
তবে মজার বিষয় হলো, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোতে পৃষ্ঠার সংখ্যা এবং “Infiltration” (অনুপ্রবেশ) শব্দটির ব্যবহার বাড়লেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
২০০৫-২০০৬ সালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৮০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে যেখানে ‘অনুপ্রবেশ’ শব্দটি ২৭ বার এসেছিল, সেখানে ২০২৪-২০২৫ সালের ৪১৩ পৃষ্ঠার বিশদ প্রতিবেদনে এই শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায় ৩৪ বার। প্রতিবেদনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক নজরদারি, বিদ্যুতায়িত বেড়া ও ফ্লাডলাইটের কথা বলা হলেও, ২০২৪ সালে এসে বিতাড়নের সংখ্যা মাত্র ২৯৫ জনে ঠেকেছে।
পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের রাজনীতিতে “অনুপ্রবেশ” কার্ড
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে “অনুপ্রবেশকারী” বা “উইপোকা” (Termites)-এর মতো তীব্র আক্রমণাত্মক শব্দ ব্যবহার করে ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা নতুন কিছু নয়। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ থেকে শুরু করে স্থানীয় স্তরের নেতারা বারবার নির্বাচনকে “অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এই মেরুকরণের রাজনীতি এক নতুন মাত্রা পায়।
বিতর্কিত ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (SIR) প্রক্রিয়ার মতো প্রশাসনিক হাতিয়ার ব্যবহার করে বিজেপি এই নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্য পায়।
পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই বিএসএফ-এর কাছে সীমান্ত বেড়া দেওয়ার জন্য জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেন, যা ৪৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে দিল্লি পুলিশের নেতৃত্বে এক বিশেষ অভিযানে প্রায় ৩,৭০০-এরও বেশি মানুষকে অবৈধ বাংলাদেশি সন্দেহে বিতাড়িত করা হয়, যেখানে বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিকদেরও হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
ভূরাজনৈতিক মানচিত্রের পরিবর্তন: দুই সীমান্তেই উগ্রপন্থার উত্থান
২০২৬ সালের নির্বাচনী ফলাফল ভারত এবং বাংলাদেশ—উভয় দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এক অদ্ভুত এবং বিপজ্জনক রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে।
এই ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১. পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বিজেপির উত্থান:
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৯টি সীমান্ত জেলায় (কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনা) বিজেপি যেখানে মাত্র ৩৫টি আসনে জয়ী হয়েছিল, ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারা একলাফে ৯১টি আসনে জয়লাভ করে।
২. বাংলাদেশে সীমান্ত জেলাগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান:
অনুরূপভাবে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী এক অভাবনীয় সাফল্য পায়।
দলটির নিজস্ব ৬৮টি আসন এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের সম্মিলিত আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৭-এ।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, জামায়াতের জেতা ৬৮টি আসনের মধ্যে ৫১টি আসনই ভারতের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে অবস্থিত।
একটি সম্ভাব্য বারুদঘর: প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার ঝুঁকি
পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের এই নতুন নির্বাচনী মানচিত্র দুই দেশের ভূরাজনীতিকে এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগস্থলে এনে দাঁড় করিয়েছে।
একদিকে ভারতের সীমান্ত জেলাগুলোতে বিজেপির সংখ্যালঘু-বিরোধী ও অনুপ্রবেশ-বিরোধী কড়া রাজনৈতিক অবস্থান,
অন্যদিকে বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে ভারতের প্রতি বৈরী মনোভাবাপন্ন জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক আধিপত্য—এই দুইয়ের সহাবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল।
সীমান্তের যেকোনো একপাশে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য যদি উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়ানো হয় বা প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেওয়া হয়, তবে তা মুহূর্তের মধ্যে দুই দেশের সম্পর্কে আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য এবং সীমান্ত সুরক্ষার জন্য এই পরিস্থিতি একটি বড় পরীক্ষা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সস্তা নির্বাচনী স্লোগানের বাইরে গিয়ে বাস্তবসম্মত এবং মানবিক কূটনৈতিক পন্থায় এই সমস্যার সমাধান না খুঁজলে, আগামী দিনে এই অঞ্চল এক বড় ধরণের অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হতে পারে।
