দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। ৩০ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ।
হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে সরকারের জবাব চাইল হাইকোর্ট
দেশজুড়ে হামের উদ্বেগজনক বিস্তার এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ হাইকোর্ট। হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জানতে চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ৩০ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার বিচারপতি রাজিক আল জলিল এবং বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালত একইসঙ্গে একটি রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের কারণ অনুসন্ধানে কেন একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে না।
তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা কেন?
হাইকোর্টের রুলে বলা হয়েছে, হামের বিস্তারের মূল কারণ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে একটি ১০ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন প্রয়োজন।
আদালত প্রস্তাবিত কমিটিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হলে রোগ বিস্তারের প্রকৃত কারণ ও স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
শিশু মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন
হাইকোর্ট রুলে আরও জানতে চেয়েছেন, হামের কারণে মারা যাওয়া শিশুদের পরিবারকে কেন পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। কারণ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণে যদি শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্নও সামনে আসে।
যাদের জবাব দিতে বলা হয়েছে
আদালত স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং আইইডিসিআরের পরিচালককে রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
এর আগে গত ১০ মে জনস্বার্থে রিট দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হুমায়ন কবির পল্লব।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান
আদালতে উপস্থাপিত তথ্যে দেখা গেছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৮ মে পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪২ হাজার ৮৬৮ জন।
এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়েন ৩৮ হাজার ৯৮০ জন। একই সময়ে সন্দেহজনক হামে মারা গেছেন ৩৮৯ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৭৫ জনের।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংখ্যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাবের ইঙ্গিত বহন করছে।
কেন বাড়ছে হাম?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাব এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল হওয়ায় হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
অনেক এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং অভিভাবকদের মধ্যে টিকা নিয়ে ভুল ধারণাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
বিশেষ করে দরিদ্রও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
হামের বিস্তার এখন সরকারের জন্য বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত গণটিকাদান কর্মসূচি,
সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
একইসঙ্গে হাসপাতালগুলোতে শিশু চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো এবং গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব নিয়ে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির গভীর সংকটকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
শিশু মৃত্যুর ঘটনা এবং আক্রান্তের উচ্চ সংখ্যা এখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সরকার আগামী ৩০ দিনের মধ্যে কী ধরনের পদক্ষেপ ও অগ্রগতি আদালতে তুলে ধরে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
