রাজধানীর গুলশানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের গোপন বৈঠক। উচ্চ আদালতে রিট খারিজ ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের চুলচেরা বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভাবনীয় ও চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে। সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এক অত্যন্ত গোপন ও রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর গুলশানের একটি সুরক্ষিত বাসভবনে কড়া গোপনীয়তা বজায় রেখে এই বৈঠকটি সম্পন্ন হয়।
সংশ্লিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, বিগত ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক নীতি এবং দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিপরীতে শুরু হওয়া আইনি প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পেতেই মূলত সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বর্তমান সরকারপ্রধানের দ্বারস্থ হয়েছেন। এই বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন দেশের রাজনীতিতে সাবেক প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও সুশাসনের প্রশ্নে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
বৈঠকের গোপন এজেন্ডা: বিচার এড়ানো ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের আকুতি
বৈঠকের ভেতরে থাকা একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে জানা গেছে,
আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং খোদ ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপের পথ বন্ধ করা।
বৈঠকে ড. ইউনূস প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এই মর্মে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অভয় ও নিশ্চয়তা চেয়েছেন,
যেন বর্তমান নির্বাচিত সরকার তাঁর বা তাঁর মেয়াদের কোনো নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে ওঠা আইনি চ্যালেঞ্জগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রশ্রয় না দেয়।
বিশেষ করে, বিগত দেড় বছরে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়ে যারা সোচ্চার ভূমিকা পালন করছেন,
তাঁদের আইনি পন্থায় শান্ত রাখা এবং মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে যেন এসব নেতিবাচক খবর প্রকাশিত না হয়
—সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
আলোচনা প্রসঙ্গে ড. ইউনূস কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে উল্লেখ করেন যে,
তাঁর সাবেক প্রেস সেক্রেটারি যেভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হতেন,
বর্তমান প্রাণবন্ত ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় তা আর সম্ভব হচ্ছে না।
ফলশ্রুতিতে, প্রতিদিন নতুন নতুন তথ্য ফাঁস হওয়ায় তিনি তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।
উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন খারিজ: সমঝোতার প্রথম দৃশ্যমান ধাপ?
গুলশানের এই স্পর্শকাতর ও রুদ্ধদ্বার বৈঠকের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় থেকে ড. ইউনূসের পক্ষে একটি বড় ধরনের স্বস্তিদায়ক খবর এসেছে।
গতকাল ২১ মে, ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সুদীর্ঘ ১৮ মাসের শাসনকালের সামগ্রিক বৈধতা, খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত এবং তড়িঘড়ি করে সম্পাদিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির আইনি ভিত্তি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মহসীন রশিদ।
হাইকোর্ট বেঞ্চ দীর্ঘ শুনানি শেষে সেই রিট আবেদনটি সরাসরি ও তাৎক্ষণিকভাবে খারিজ করে দিয়েছে।
শুনানিতে বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এই রিট পিটিশনটির তীব্র বিরোধিতা করেন।
তিনি আদালতে যুক্তি দেখান যে:
- এই আবেদনটি সম্পূর্ণ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং এর পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি নেই।
- দেশ এখন কোনো জরুরি অবস্থা বা অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থায় নেই, বরং একটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ও সক্রিয় সংসদ বিদ্যমান রয়েছে।
- আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে পরিষ্কার জানিয়েছেন, দেশের শাসনভার পরিচালনার জন্য যেহেতু একটি প্রাণবন্ত সংসদ ও নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রয়েছেন, তাই সাবেক সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের জন্য আদালতের এই মুহূর্তে আগ বাড়িয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো আইনগত প্রয়োজনীয়তা নেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন,
গুলশানের গোপন বৈঠকের পরপরই সরকারের এই সুর বদল এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে সাবেক প্রশাসনকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার প্রচেষ্টা মূলত পর্দার আড়ালের ‘কৌশলগত সমঝোতার’ প্রথম দৃশ্যমান ফল।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: ন্যায়বিচার বঞ্চিত পরিবারের কান্নায় ভারী বাতাস
সাবেক প্রধান উপদেষ্টাকে আইনি রক্ষাকবচ দেওয়ার রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার আরেকটি কালো অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে গত ৭ মে’র একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনাকে।
ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের একটি বিমান দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে নিহত এক শিক্ষার্থীর বাবা উসাইমং মারমা ন্যায়বিচারের আশায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালতে একটি হত্যা বা গাফিলতির মামলা দায়ের করার আবেদন করেছিলেন।
কিন্তু আদালত কোনো প্রকার সন্তোষজনক কারণ ছাড়াই সেই মামলার আবেদনটি সরাসরি গ্রহণ না করে বাতিল করে দেয়।
মাইলস্টোন স্কুল ট্র্যাজেডির বর্তমান চিত্র
├── শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যু ➔ পরিবারের আইনি লড়াই
├── আদালতে মামলার আবেদন ➔ সরাসরি বাতিল
└── ভুক্তভোগী পরিবারকে হয়রানি ➔ 'কুকি-চিন' ট্যাগ দেওয়ার অপচেষ্টা
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো,
মামলাটি দায়েরের পর থেকে আবেদনকারী উসাইমং মারমাকে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পুলিশের মাধ্যমে চরম মানসিক ও শারীরিক হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, ওই সন্তানহারা পিতাকে পাহাড়ের সশস্ত্র ও বিতর্কিত গোষ্ঠী ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ (KNF)-এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে সাজানোর একটি নগ্ন অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
এর একমাত্র মূল উদ্দেশ্য হলো,
তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন এক ভয়ের আবর্তে ফেলে দেওয়া যাতে সে বাধ্য হয়ে নিজের সন্তানের মৃত্যুর বিচার চাওয়ার পথ থেকে স্থায়ীভাবে সরে দাঁড়ায়।
রাজনৈতিক দাবার চাল: ‘রক্ষণাত্মক’ নীতিতে তারেক রহমানের প্রশাসন
রাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক এবং দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় বসার পর ড. ইউনূস ও তাঁর সহযোগীদের এক প্রকার অলিখিত ‘রাজনৈতিক পাহারায়’ বা সুরক্ষায় রেখেছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার একের পর এক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, রিজার্ভের অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার অকাট্য দালিলিক প্রমাণ প্রতিনিয়ত সাধারণ জনগণের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে, তবুও কৌশলগত ভূরাজনৈতিক স্বার্থে বর্তমান সরকার ড. ইউনূসকে একটি আইনি ঢাল প্রদান করছে।
সমালোচকদের মতে, ক্ষমতার এই মসৃণ পালাবদলের নেপথ্যে যদি কোনো ধরনের ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ বা পারস্পরিক স্বার্থের সমঝোতা কার্যকর থাকে,
তবে তা দেশের সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারকে বুড়ো আঙুল দেখাবে।
আওয়ামী সরকারের পতনের পর দেশের মানুষ একটি বৈষম্যহীন ও আইনের শাসনের প্রত্যাশা করেছিল,
যেখানে অপরাধী যে-ই হোক না কেন তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
কিন্তু বর্তমানের এই রাজনৈতিক সুরক্ষার সংস্কৃতি নতুন করে এক গভীর হতাশার জন্ম দিচ্ছে।
জনগণের দরবারে বড় প্রশ্ন: আইনের শাসন কি আপসের কাছে জিম্মি?
আজকের উচ্চ আদালতের এই রায় এবং গুলশানের সেই গোপন বৈঠকের খবরটি রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের মহলে এক তীব্র আলোড়ন ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব জায়গাতেই এখন একটিই বড় প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে:
“বিগত ১৮ মাসের দুঃশাসন ও অব্যবস্থাপনার কি কোনো সুষ্ঠু তদন্ত হবে না? আইনের শাসন এবং অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার কি শেষ পর্যন্ত শীর্ষ নেতাদের ঘরোয়া ও রাজনৈতিক আপস-সমঝোতার কাছে নতি স্বীকার করছে?”
যদি অতীতের সমস্ত অপরাধকে কেবল ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’ বা বিশেষ ব্যক্তির আন্তর্জাতিক ইমেজের দোহাই দিয়ে ধামাচাপা দেওয়া হয়,
তবে তা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেবে বলে মনে করেন দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ।
