দেশের বিভিন্ন নদী থেকে এক সপ্তাহে ১৭ জনের লাশ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। ৯৬টি মামলাসহ গ্রেপ্তার ৩০২ জন। জব্দ করা হয়েছে কোটি টাকার অবৈধ কারেন্ট জাল ও মাছ।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ধমনী হলো এর বিস্তৃত নদীপথ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের এই নৌপথগুলো অপরাধী চক্র ও চোরাকারবারিদের একটি নিরাপদ চারণভূমিতে পরিণত হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মে ২০২৬-এর মাঝামাঝি সময়ে এসে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদ-নদী থেকে ১৭ জনের প্রাণহীন মরদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। নৌ পুলিশের সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রশাসনিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। নৌপথে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং মৎস্য সম্পদ রক্ষায় পরিচালিত ধারাবাহিক অভিযানের মধ্যেই এই বিশাল সংখ্যক লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি ঘটে।
এই ঘটনায় নদীকেন্দ্রিক অপরাধের ভয়াবহতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে।
অপরাধের খতিয়ান: ৩টি হত্যাকাণ্ড এবং অপমৃত্যুর মামলার সংখ্যা
নৌ পুলিশের বিশেষ গোয়েন্দা ও অপারেশনাল শাখার তথ্য অনুযায়ী,
গত ১৫ মে থেকে ২১ মে ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র সাত দিনের বিশেষ অভিযানে দেশের বিভিন্ন নদী, খাল ও উপকূলীয় অঞ্চল থেকে মোট ১৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকৃত এই লাশগুলোর ময়নাতদন্ত ও প্রাথমিক তদন্তের ওপর ভিত্তি করে দেশের বিভিন্ন নৌ-থানায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এর সুনির্দিষ্ট খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো:
- পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড: উদ্ধারকৃত মরদেহের মধ্যে অন্তত ৩টি ঘটনার পেছনে সুনির্দিষ্ট এবং সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই বিষয়ে নৌ পুলিশ বাদী হয়ে ৩টি পৃথক হত্যা মামলা দায়ের করেছে।
- রহস্যজনক অপমৃত্যু: বাকি ১৪টি মরদেহের মধ্যে ১১টি ঘটনার ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে কোনো প্রত্যক্ষ ঘাতকের সন্ধান না পাওয়ায় সেগুলোকে অপমৃত্যু বা ‘ইউডি’ (Unnatural Death) মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। তবে এই অপমৃত্যুগুলোর পেছনে কোনো দুর্ঘটনা, নাকি কোনো অদৃশ্য অপরাধচক্রের হাত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে নৌ পুলিশের গোয়েন্দা দল।
এক নজরে নৌ পুলিশের মেগা ড্রাইভ: ৯৬টি মামলার বিশদ বিবরণ
নদীপথের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডের কোমর ভেঙে দিতে গত এক সপ্তাহে সারা দেশে মোট ৯৬টি বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। নৌ পুলিশের সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেবল লাশ উদ্ধারই নয়, বরং নদীকেন্দ্রিক প্রায় সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধেই এই সাত দিন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল।
দায়েরকৃত মামলাগুলোর একটি সুনির্দিষ্ট শ্রেণিবিন্যাস নিচে আলোচনা করা হলো:
১. মৎস্য আইনের অধীনে সর্বোচ্চ মামলা:
নদী ও সাগরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং মা মাছ ও রেণু পোনা শিকার রোধে মৎস্য আইনের অধীনে সর্বোচ্চ ৬৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
জাটকা নিধন এবং নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের অপরাধে এই মামলাগুলো করা হয়।
২. বেপরোয়া গতি ও নৌ-দুর্ঘটনা প্রতিরোধ:
নদীপথে ফিটনেসবিহীন নৌযান চালানো এবং চালকদের বেপরোয়া গতির কারণে প্রতি বছর বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
এটি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে বেপরোয়া গতি আইনের অধীনে ১৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
৩. অন্যান্য গুরুতর অপরাধের মামলা:
এছাড়াও নৌপথে ডাকাতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং মাদক পাচারের মতো স্পর্শকাতর অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- ডাকাতি প্রতিরোধ আইনে: ১টি মামলা
- অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ে: ১টি মামলা
- অবৈধ চাঁদাবাজি ও ঘাটের দখলদারিত্বে: ১টি মামলা
- মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে: ১টি মামলা
- অবৈধ বালুমহাল ও মাটি কাটা আইনে: ১টি মামলা
- বিশেষ ক্ষমতা আইনে: ১টি মামলা
অপরাধীদের জালে নৌ পুলিশ: এক সপ্তাহে ৩০২ জন গ্রেপ্তার
নৌপথের এই বিশাল অপরাধযজ্ঞের সাথে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ৩০২ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নৌ পুলিশের পৃথক পৃথক দল নদী ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে এই আসামিদের আটক করে।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে চিহ্নিত নদী-ডাকাত, অবৈধ বালু ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ এবং নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের কারবারিরা রয়েছে।
নৌ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত এই ব্যক্তিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং এদের গডফাদারদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
