চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় সহযোগিতার নাম করে ৭১ বছর বয়সী এক বৃদ্ধাকে ধর্ষণের অভিযোগে ২০ বছরের তরুণ তরিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় মডেল থানা পুলিশ।
নিজস্ব প্রতিবেদক | দামুড়হুদা, চুয়াডাঙ্গাপ্রকাশিত: ২৫ মে, ২০২৬ মানবিকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ঙ্কর পৈশাচিকতার রূপ দেখলো চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলা। ‘আপনি বয়স্ক মানুষ, একা একা কষ্ট করছেন কেন? হাতের ভারী ব্যাগটা আমাকে দিন, আমি আপনাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি’— ঠিক এই দরদি বাক্যগুলোই ছিল এক বৃদ্ধার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নের শুরু। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ছদ্মবেশে এক ৭১ বছর বয়সী বিধবা নারীকে নির্জন মাঠে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ২০ বছরের এক তরুণের বিরুদ্ধে। গত ২০ মে (বুধবার) দুপুরে দামুড়হুদা উপজেলার লোকালয় সংলগ্ন একটি মাঠে এই জঘন্য অপরাধটি সংঘটিত হয়। ঘটনার পর দীর্ঘ পাঁচ দিন পার করে অবশেষে ভুক্তভোগী নারী নিজে বাদী হয়ে দামুড়হুদা মডেল থানায় একটি এজাহার দায়ের করেছেন। মামলা রুজু হওয়ার পরপরই পুলিশি অভিযানে অভিযুক্ত তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে: বিশ্বাসের সুযোগে নৃশংসতা
থানায় দায়ের করা মামলার বিবরণী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ মে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভুক্তভোগী ওই বৃদ্ধা তাঁর মেয়ের বাড়ি থেকে ফিরছিলেন।
মেয়ের বাড়ি থেকে দেওয়া কিছু তরকারি ও মাছ একটি ব্যাগে নিয়ে তিনি স্থানীয় হাসপাতালের সামনে এসে ভ্যান থেকে নামেন।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ওই নারী যখন ব্যাগটি হাতে নিয়ে একা একা বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করেন,
ঠিক তখনই তাঁর সামনে হাজির হয় উপজেলার মো. তরিকুল ইসলাম (২০) নামের এক তরুণ।
নিজেকে অত্যন্ত ভদ্র ও পরোপকারী দাবি করে তরিকুল ওই বৃদ্ধার কাছ থেকে জোর করেই ব্যাগটি চেয়ে নেয়।
সে বৃদ্ধাকে আশ্বস্ত করে বলে, রোদ ও গরমে তাঁর কষ্ট হচ্ছে, তাই সে ব্যাগটি বহন করে তাঁকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।
সরল বিশ্বাসে ওই বৃদ্ধা তরুণের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। তিনি তরিকুলের পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করেন।
তবে তরিকুল তাঁকে মূল সড়ক দিয়ে না নিয়ে একটি নির্জন মাঠের ভেতরের রাস্তা দিয়ে নিয়ে যেতে থাকে।
দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে, যখন চারপাশ সম্পূর্ণ জনমানবহীন ছিল, তখন তরিকুল তার আসল রূপ ধারণ করে।
অসহায় বৃদ্ধার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সে এবং পাশবিক নির্যাতন চালায়।
সামাজিক লোকলজ্জা ও পাঁচ দিনের মানসিক বিপর্যয়
নৃশংস এই ঘটনার পর থেকে ওই বৃদ্ধা শারীরিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন।
৭১ বছর বয়সে এসে এমন চরম লাঞ্ছনা ও ট্রমার মুখোমুখি হয়ে তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন।
ভুক্তভোগীর এক নাতনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, ঘটনার পর থেকে তাঁর নানি চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন।
তিনি লোকলজ্জা এবং সমাজের কটু কথার ভয়ে প্রথম দিকে বিষয়টি কাউকে বলতে পারেননি।
প্রতিবেশীদের কয়েকজন ঘটনাটি জানার পর ঘটনাটি চেপে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
তাদের দাবি ছিল, এই বয়সে মামলা-মোকদ্দমা করলে পরিবারের “মান-সম্মান” ক্ষুণ্ন হবে।
তবে পরবর্তীতে পরিবারের অন্য সদস্যরা যখন বৃদ্ধার অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করেন এবং ঘটনাটি পুরোপুরি জানতে পারেন, তখন তাঁরা আইনি লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেন।
লোকলজ্জার প্রাচীর ভেঙে অপরাধীকে শাস্তির মুখোমুখি করতেই পাঁচ দিন পর থানায় যাওয়ার সাহস দেখান তাঁরা।
মাঝরাতে আইনি তৎপরতা: অভিযুক্ত তরিকুল গ্রেপ্তার
রোববার (২৪ মে) দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে ভুক্তভোগী বৃদ্ধা নিজেই বাদী হয়ে দামুড়হুদা মডেল থানায় উপস্থিত হন।
সেখানে তরিকুল ইসলামকে একমাত্র আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়।
মামলা নথিভুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই দামুড়হুদা মডেল থানা পুলিশ দ্রুত অ্যাকশনে নামে।
রাতের অন্ধকারেই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত তরুণ তরিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
দামুড়হুদা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান,
“মামলা দায়েরের পর আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি এবং রাতেই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি।
ভুক্তভোগী নারীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা (মেডিকেল টেস্ট) এবং আদালতে তাঁর জবানবন্দি গ্রহণের আইনি প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। অপরাধী যেই হোক, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
আপসের চাপ ও প্রভাবশালীদের অনৈতিক তৎপরতা
এদিকে মামলা দায়ের এবং আসামি গ্রেপ্তার হলেও ভুক্তভোগী পরিবারটি এখন এক নতুন আতঙ্কের মুখোমুখি।
পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মাতব্বররা বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
অভিযুক্ত তরুণকে আইনি জটিলতা থেকে রক্ষা করতে এবং থানা থেকে অভিযোগ প্রত্যাহার করার জন্য ভুক্তভোগীর পরিবারকে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
এমনকি বিষয়টি গ্রামীণ সালিশ বা আপসের মাধ্যমে মীমাংসা করার জন্য হুমকি-ধমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্যাতিতার পরিবারের এক সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“৭১ বছরের একজন বৃদ্ধা মা, যিনি এই সমাজের সবার কাছে শ্রদ্ধার পাত্র, তাঁর সাথে এমন পৈশাচিকতার পরও কীভাবে মানুষ আপসের কথা বলতে পারে?
আমরা কোনো টাকা বা সালিশ চাই না, আমরা এই নরপশুর দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসি চাই।”
সমাজবিজ্ঞানীদের উদ্বেগ: নৈতিক অবক্ষয় কোন স্তরে?
তরুণদের একাংশের মধ্যে এই ধরণের অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
একজন ২০ বছরের যুবকের হাত থেকে যখন ৭১ বছরের এক বৃদ্ধাও নিরাপদ নন, তখন বুঝতে হবে সামাজিক মূল্যবোধের চরম ধস নেমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, মাদকাসক্তি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি তরুণ সমাজকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই ধরণের অপরাধের ক্ষেত্রে যদি স্থানীয় প্রভাবশালীরা আপস-মীমাংসার চেষ্টা করে, তবে তা বিচার ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি। এদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
শেষ কথা: সুষ্ঠু বিচারের দাবি চুয়াডাঙ্গাবাসীর
দামুড়হুদার এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অপরাধী তরিকুল এবং তাকে রক্ষাকারীদের শাস্তির দাবিতে ঝড় উঠেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, পুলিশ যেন কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপে নতি স্বীকার না করে।
দ্রুত তদন্ত শেষ করে চার্জশিট প্রদান এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই অপরাধের কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন চুয়াডাঙ্গার সর্বস্তরের নাগরিক।
একজন অসহায় নারীর সরলতার সুযোগ নিয়ে যে বর্বরতা চালানো হয়েছে, তার উপযুক্ত বিচারই কেবল সমাজের এই ক্ষত কিছুটা হলেও উপশম করতে পারে।
