বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী, প্রবীণ সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ আর নেই। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর আজ সোমবার (১ জুন) বিকেলে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না লিল্লাহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে এই বর্ষীয়ান জননেতার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান ঘটলো।
হাসপাতাল প্রশাসন এবং তাঁর পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে আজ বিকেল ৪টায় এই তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিরবিদায়
পারিবারিক ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তোফায়েল আহমেদ দীর্ঘ দিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।
বিশেষ করে প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাতগ্রস্ততা এবং অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে বেশ কিছু দিন ধরেই কাবু করে রেখেছিল।
গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরবর্তীতে অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন এবং একপর্যায়ে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
দীর্ঘ কয়েক মাস মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে আজ বিকেলে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
হাসপাতালের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে,
তোফায়েল আহমেদ মূলত নিউমোনিয়াজনিত তীব্র শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগের জটিলতা এবং বার্ধক্যজনিত চরম শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন।
চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
ভোলার কোড়ালিয়া থেকে জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে
তোফায়েল আহমেদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা নদীবিধৌত জেলা ভোলায়।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
গ্রামীণ পরিবেশ থেকে উঠে এসে তিনি যেভাবে জাতীয় রাজনীতির মূলমঞ্চে নিজের স্থান করে নিয়েছিলেন, তা ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রখর মেধা ও নেতৃত্বের গুণাবলীর পরিচয় দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়েই তিনি সক্রিয় ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ডাকসুর সেই সোনালী দিনগুলো
বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এক টার্নিং পয়েন্ট। আর এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তৎকালীন ছাত্রসমাজ।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তোফায়েল আহমেদ।
তৎকালীন আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আমজনতাকে ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর সুতীক্ষ্ণ ও ওজস্বী বক্তৃতা তৎকালীন তরুণ সমাজকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছিল।
এই গণ-অভ্যুত্থানের সফল নেতৃত্বের মাধ্যমেই তিনি দেশজুড়ে এক পরিচিত ও জনপ্রিয় ছাত্রনেতায় পরিণত হন।
মাত্র ২৭ বছর বয়সে জাতীয় পরিষদে প্রবেশ ও সংসদীয় রেকর্ড
তোফায়েল আহমেদের সংসদীয় রাজনীতির ক্যারিয়ার ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ এবং গৌরবময়।
১৯৭০ সালের অবিস্মরণীয় সাধারণ নির্বাচনে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন, যা তৎকালীন সময়ে তরুণ নেতৃত্বের এক বিরল দৃষ্টান্ত ছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশেও তিনি তাঁর জনপ্রিয়তার ধারা বজায় রাখেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন মেয়াদে আরও ৮ বার স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ভোলা তথা দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ‘মুজিব বাহিনী’র আঞ্চলিক অধিনায়কত্ব
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তোফায়েল আহমেদের অবদান এদেশের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
তিনি ছিলেন স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং অগ্রবর্তী দলের নেতা।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গঠিত বিশেষায়িত বাহিনী ‘মুজিব বাহিনী’ (লিবারেশন ফোর্স)-এর অন্যতম আঞ্চলিক অধিনায়ক (রিজিওনাল কমান্ডার) হিসেবে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, ভারতে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং যুদ্ধের রণকৌশল নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনেও তিনি অনন্য অবদান রাখেন।
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন
রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি তোফায়েল আহমেদ দেশের শাসনকার্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
১৯৯৬ সালে যখন তৎকালীন দীর্ঘ মেয়াদ পর দল সরকার গঠন করে, তখন তিনি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক নানামুখী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালেও তিনি পুনরায় সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক খাত সম্প্রসারণে কাজ করেন। আমৃত্যু তিনি এই দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম শীর্ষ সদস্য হিসেবে গণ্য হতেন।
একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি
তোফায়েল আহমেদের চলে যাওয়া বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও ত্যাগী রাজনৈতিক ধারায় এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করলো।
তিনি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি ছিলেন, যারা সরাসরি স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সামাজিক সংগঠন এবং প্রবাসে থাকা বাংলাদেশী কমিউনিটি।
পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতাল থেকে মরদেহ স্থানান্তরের পর তাঁর জানাজা ও দাফনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তাঁর নিজ জেলা ভোলায় এবং রাজধানীতে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীদের উপস্থিতিতে শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।
