তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবন, গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা, আওয়ামী লীগে অবদান ও মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের স্মৃতিচারণ।
তোফায়েল আহমেদ: রাজনীতির আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু নেতা রয়েছেন, যাদের জীবন ও সংগ্রাম একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করে। সদ্যপ্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তেমনই একজন রাজনীতিক। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে এক শূন্যতা। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সম্প্রতি প্রকাশিত এক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় তোফায়েল আহমেদকে বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে ‘এক উজ্জ্বল নক্ষত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ছাত্র আন্দোলন থেকে জাতীয় নেতৃত্বে উত্থান
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান। ছাত্রজীবনে তিনি তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্রলীগের একজন সাধারণ কর্মী ছিলেন। সে সময় ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর সামনে বৃহত্তর রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মুখপাত্র হিসেবে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন। আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি, বক্তব্য ও নির্দেশনা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় থেকেই তিনি কেবল ছাত্রনেতা নয়, জননেতা হিসেবেও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
সংগ্রামের রাজপথে সেলিম-তোফায়েল সম্পর্ক
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, রাজনৈতিক আদর্শে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন একসঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন তারা। একজন সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিক হিসেবে সেলিম এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও উদারপন্থার অনুসারী তোফায়েল আহমেদের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য ছিল স্পষ্ট।
তবে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে তারা একসঙ্গে কাজ করেছেন। রাজপথের মিছিল, পিকেটিং, পুলিশি নির্যাতন এবং কারাবরণের অভিজ্ঞতাও তাদের রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সেলিমের ভাষায়, তাদের সম্পর্ক ছিল ‘দ্বন্দ্ব ও ঐক্যের’ এক বাস্তব উদাহরণ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য কখনোই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে নষ্ট করতে পারেনি।
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তোফায়েল আহমেদকে তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দেন। সে সময় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল।
তবে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনার কারণে বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগের দূরত্ব তৈরি হয়। ১৯৭৩ সালে ছাত্রনেতা মতিউল ও কাদের হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৭৪ সালের মহসীন হলের সেভেন মার্ডারসহ বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছিল।
এসব বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সম্মান অটুট ছিল বলে স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন সেলিম।
১৯৭৫-পরবর্তী সময় ও আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনে ভূমিকা
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তোফায়েল আহমেদ কারাবরণ করেন। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ যখন কঠিন সময় অতিক্রম করছিল, তখন দলকে সংগঠিত করা এবং নেতৃত্বের সংকট কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করা এবং দলীয় কোন্দল নিরসনে তাঁর অবদান রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছেও স্বীকৃত।
সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময়ও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সমন্বয় তৈরিতেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে অবস্থান
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক সততা ও আত্মসমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টিও।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনগুলো নিয়ে তাঁর অস্বস্তির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সেলিম উল্লেখ করেন, এক নির্বাচনে বিজয়ের পর তাঁকে অভিনন্দন জানালে তোফায়েল আহমেদ মৃদু হাস্যরসের সঙ্গে বলেছিলেন, “আর লজ্জা দিও না।”
এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে তিনি গভীরভাবে সচেতন ছিলেন। যদিও দলীয় শৃঙ্খলা ও
রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তিনি অনেক বিষয় প্রকাশ্যে বলেননি, তবুও গণতন্ত্র ও জনসমর্থনের গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি ছিল সুস্পষ্ট।
ব্যক্তিজীবনে একজন অমায়িক মানুষ
রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদের পাশাপাশি তাঁর মানবিক ব্যক্তিত্বের কথাও তুলে ধরেছেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
অসাধারণ স্মৃতিশক্তির জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। বিভিন্ন ব্যক্তির টেলিফোন নম্বর পর্যন্ত মুখস্থ বলতে পারতেন।
পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি জীবনযাপন তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। পোশাক-পরিচ্ছদে তিনি সবসময় সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলার ছাপ বজায় রাখতেন।
পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল। স্ত্রী, কন্যা এবং জামাতার প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলেও স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও মূল্যায়ন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদের অবদান বহুমাত্রিক। ছাত্র আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন
এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মূল্যায়নে, রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও তোফায়েল আহমেদ ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য, বিশ্বস্ত
এবং আন্তরিক সহযোদ্ধা। জাতীয় স্বার্থ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রশ্নে তাঁর ভূমিকা সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু শুধু আওয়ামী লীগের জন্য নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্যও একটি বড় ক্ষতি।
ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা নতুন প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যয়ন বিষয় হয়ে থাকবে।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের যে উদাহরণ তিনি রেখে গেছেন, তা ভবিষ্যতের রাজনীতিবিদদের জন্য শিক্ষণীয়
হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম একজন প্রভাবশালী জননেতা হিসেবে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
