২০২৫ সালে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে ঢামেক হাসপাতালে এসেছেন ১১০০ নারী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি নারী ও শিশু নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরলেন ফরেনসিক বিভাগের প্রধান
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের একটি তথ্য। বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান জানিয়েছেন, শুধু ২০২৫ সালেই ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে ১১০০ জন নারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন।
শনিবার (৬ জুন) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ তথ্য প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এই সংখ্যা দেশের নারী ও শিশু নির্যাতনের একটি উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
বাস্তব চিত্র আরও বড় হতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতাল বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পৌঁছানো ঘটনাগুলোই কেবল পরিসংখ্যানে আসে। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ, বিচারহীনতার আশঙ্কা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগই করেন না।
ফলে শুধু ঢামেক হাসপাতালে ১১০০ নারী ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে আসার ঘটনা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি অংশমাত্র হতে পারে। রাজধানীর বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে যেসব অভিযোগ আসে, সেগুলো যুক্ত করলে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গোলটেবিল বৈঠকে যা উঠে এসেছে
আলোচনায় অংশ নেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ এবং আইনজীবী রাশনা ইমামসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি।
বৈঠকে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শিশুদের নৈতিক শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তাঁর মতে, পরিবার থেকেই মূল্যবোধ ও মানবিক শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে অপরাধ প্রবণতা কমানো সম্ভব।
অন্যদিকে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে একটি শিশু সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানান।
নারী ও শিশু সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের দাবি
আলোচকরা মনে করেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা কমাতে দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগী সুরক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার আহ্বান
মানবাধিকার কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন,
যৌন সহিংসতার অনেক ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়া কিংবা অভিযুক্তদের প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
তাদের মতে, অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা গেলে সমাজে একটি শক্ত বার্তা যাবে এবং অপরাধ প্রবণতা কমতে পারে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক বছরে ১১০০ নারী ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে আসার তথ্য দেশের নারী ও শিশু নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে
গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল নিবন্ধিত অভিযোগের একটি অংশ। তাই নারী ও শিশু নির্যাতন
প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
