ট্রাম্প-মোজতবা বৈঠকের সম্ভাবনা নাকচ করে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর সতর্কবার্তা দিল ইরান। আঞ্চলিক সংঘাত, হরমুজ ও পরমাণু ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা।
ট্রাম্প-মোজতবা বৈঠক নাকচ, যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া বার্তা ইরানের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে জল্পনার মধ্যেই সেই সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে তেহরান। ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের উপদেষ্টা ও ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর সাবেক প্রধান কমান্ডার মোহসেন রেজায়ি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ট্রাম্প ও মোজতবা খামেনির মধ্যে কোনো বৈঠক হবে না। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে সামরিক আগ্রাসন থেকে বিরত থাকার কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
বৈঠকের সম্ভাবনা একেবারেই নেই
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সম্ভাব্য সাক্ষাৎকে নিজের জন্য ‘সম্মানের’ বিষয় বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম CNN-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোহসেন রেজায়ি সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেন।
তার ভাষায়, “এমন কোনো বৈঠক হবে না।” এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্পষ্ট বক্তব্য নতুন করে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্বের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি
সাক্ষাৎকারে রেজায়ি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, যদি ওয়াশিংটন আবারও ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, “ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র একটি অন্ধকার ও অন্তহীন সুড়ঙ্গে প্রবেশ করবে।” তার দাবি, মার্কিন প্রশাসনও জানে যে যুদ্ধের খরচ ও ঝুঁকি আলোচনার তুলনায় অনেক বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে তেহরান একদিকে সামরিক প্রতিরোধের বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমাধানের দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার হুঁশিয়ারি
রেজায়ি আরও দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকলে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামুদ্রিক অঞ্চলে ছড়িয়ে যেতে পারে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য সংঘাতের প্রভাব পড়তে পারে—
- ভারত মহাসাগরে
- লোহিত সাগরে
- বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে
- ভূমধ্যসাগরে
তিনি সতর্ক করেন, এমন পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন বার্তা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালি নিয়েও বক্তব্য দিয়েছেন রেজায়ি।
তিনি বলেন, সাধারণ বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য প্রণালিটি নিরাপদ রয়েছে। তবে সেখানে যদি নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করা হয় বা সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে ইরান কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
রেজায়ির মতে, হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের অংশ হওয়ায় উভয় দেশের পরিবেশগত সুরক্ষা ও ট্রানজিট ফি সংক্রান্ত অধিকার রয়েছে।
পরমাণু চুক্তি নিয়ে অনাস্থা
সাক্ষাৎকারে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কথা বলেন আইআরজিসির সাবেক এই কমান্ডার।
তিনি দাবি করেন, ইরান আন্তর্জাতিক আইন ও পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT)-এর আওতায় থেকে কাজ করছে। তবে ২০১৫ সালের যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (JCPOA) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে ওয়াশিংটনের ওপর আস্থা হারিয়েছে তেহরান।
রেজায়ি বলেন, “যেহেতু ট্রাম্প পূর্বের চুক্তি বাতিল করেছিলেন, তাই তার সঙ্গে নতুন কোনো চুক্তি নিয়ে বর্তমানে ইরানের আগ্রহ নেই।”
এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে পারমাণবিক ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান এখনও অনেক দূরে রয়েছে।
অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্তির দাবি
ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি হচ্ছে বিদেশে আটকে থাকা তাদের আর্থিক সম্পদ মুক্ত করা।
রেজায়ি অভিযোগ করেন, তেহরান বারবার এ বিষয়ে পরিষ্কার অবস্থান জানালেও যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না। তার মতে, ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করা হলে সেটিই হবে দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ।
তিনি বলেন, “এটি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিকতার ন্যূনতম পরীক্ষা হতে পারে।”
কুয়েতে হামলার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান
কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছেন মোহসেন রেজায়ি।
তার দাবি, ইরান কোনো বেসামরিক স্থাপনা নয়, বরং কুয়েতে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকেই লক্ষ্যবস্তু করেছিল।
তিনি বলেন, ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়া কেবল মার্কিন স্বার্থ ও সামরিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিল।
‘প্রচলিত যুদ্ধের যুগ শেষ’
বর্তমান সংঘাত থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার আলোকে রেজায়ি বলেন, আধুনিক বিশ্বে প্রচলিত যুদ্ধের কার্যকারিতা কমে গেছে।
তার মতে, বর্তমানে অসম যুদ্ধ (Asymmetric Warfare), প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল এবং সৃজনশীল সামরিক পদ্ধতি অনেক বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাশাপাশি স্থলবাহিনীর সক্ষমতার বিষয়েও তিনি আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, রেজায়ির সাম্প্রতিক বক্তব্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
বৈঠকের সম্ভাবনা নাকচ করার পাশাপাশি ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা সামরিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়।
অন্যদিকে, কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখলেও তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও স্পষ্ট ও বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে।
ফলে ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে পরবর্তী কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
