বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নেয়। জেনে নিন ছয় দফার ইতিহাস ও তাৎপর্য।
স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ৭ জুন এক অনন্য তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৬৬ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির সমর্থনে পূর্ব বাংলাজুড়ে গণআন্দোলনের সূচনা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছয় দফা ছিল বাঙালির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক মুক্তির সনদ, যা পরবর্তীকালে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ভিত্তি তৈরি করে।
আজ ৭ জুন, ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস। দিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোচনা সভা, র্যালি, শ্রদ্ধা নিবেদন এবং নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।
ছয় দফার পেছনের প্রেক্ষাপট
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। জনসংখ্যার দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক সম্পদ, সামরিক বাহিনী এবং প্রশাসনে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধিত্ব ছিল সীমিত।
ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং বিভিন্ন গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলতে থাকে। কিন্তু ষাটের দশকে এসে সেই আন্দোলন নতুন মাত্রা পায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে।
তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কাঠামো এবং বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। সেই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নেয় ঐতিহাসিক ছয় দফা।
লাহোর সম্মেলনে ছয় দফার উত্থান
১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন।
তবে আয়োজকরা বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়ায় বঙ্গবন্ধু প্রতিবাদস্বরূপ সম্মেলনের মূল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে তিনি নিজ উদ্যোগে ছয় দফা কর্মসূচি জনগণের সামনে তুলে ধরেন।
১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ফিরে বঙ্গবন্ধু দেশব্যাপী ছয় দফার পক্ষে প্রচারণা শুরু করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
কী ছিল ছয় দফার মূল বক্তব্য?
ছয় দফার প্রধান লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।
ছয় দফার মূল বিষয়গুলো ছিল—
১. প্রকৃত অর্থে ফেডারেল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
২. কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত করা।
৩. পৃথক বা কার্যকর মুদ্রাব্যবস্থা চালু করা।
৪. রাজস্ব ও কর আদায়ের ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে দেওয়া।
৫. বৈদেশিক বাণিজ্য ও মুদ্রা আয়ের ওপর প্রাদেশিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।
৬. পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক মিলিশিয়া বা আধাসামরিক বাহিনী গঠন।
এসব দাবি মূলত পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক শোষণ বন্ধ এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই প্রণয়ন করা হয়েছিল।
‘বাঙালির মুক্তির সনদ’ কেন বলা হয়?
ইতিহাসবিদদের মতে, ছয় দফা ছিল বাঙালির জাতীয় মুক্তির রূপরেখা। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ছিল স্বায়ত্তশাসনের দাবি, বাস্তবে এর মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধু নিজেও ছয় দফাকে ‘আমাদের বাঁচার দাবি’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কারণ এই কর্মসূচি বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তি, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন
এবং সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিল।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন
ছয় দফা আন্দোলন জনপ্রিয়তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বারবার গ্রেফতার করা হয় এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়।
ছয় দফা আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে পাকিস্তান সরকার তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে।
এই মামলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুসহ অনেক বাঙালি নেতাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।
কিন্তু জনগণের তীব্র আন্দোলন এবং ছাত্রসমাজের ১১ দফা কর্মসূচির চাপে শেষ পর্যন্ত সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়।
ছয় দফা থেকে গণঅভ্যুত্থান
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পেছনে ছয় দফা আন্দোলন ছিল অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। আন্দোলনের চাপে আইয়ুব খান সরকারের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
একই সময়ে বঙ্গবন্ধু জনগণের কাছে জাতীয় নেতায় পরিণত হন। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৬৯ সালের গণজাগরণ ছিল ছয় দফার রাজনৈতিক সফলতার প্রথম বড় অর্জন।
স্বাধীনতার পথে ছয় দফার অবদান
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের অন্যতম কারণ ছিল ছয় দফা কর্মসূচি।
জনগণ এই কর্মসূচির প্রতি আস্থা রেখেই আওয়ামী লীগকে বিপুল সমর্থন দেয়।
কিন্তু নির্বাচনে বিজয় লাভের পরও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু করে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। এর ফলে রাজনৈতিক সংকট চরমে পৌঁছে।
পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, অসহযোগ আন্দোলন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ।
অনেক গবেষক মনে করেন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণাপত্রের পূর্বসূরি।
আজও প্রাসঙ্গিক ছয় দফার চেতনা
ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও ঐতিহাসিক ছয় দফা বাঙালির জাতীয় চেতনায় অমলিন হয়ে আছে।
এটি শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং অধিকার আদায়, গণতন্ত্র, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে ছয় দফা আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রামের পেছনে এই কর্মসূচির ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ইতিহাসে ছয় দফা আন্দোলন এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
