নিজের ছয়তলা বাড়িতে থাকতে না পেরে ভাড়া বাসায় আশ্রয় বৃদ্ধ বাবার। ছোট ছেলের বিরুদ্ধে বাড়ি দখল, ভয়ভীতি ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলা।
নিজের গড়া বাড়িতে ঠাঁই নেই বৃদ্ধ বাবার
রাজধানীর মিরপুরের কাফরুল এলাকায় নিজের উপার্জনের অর্থে নির্মিত ছয়তলা ভবনের মালিক হয়েও সেখানে থাকতে পারছেন না এক বৃদ্ধ বাবা। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ও শারীরিকভাবে অসুস্থ এই ব্যক্তি বর্তমানে বড় ছেলের সঙ্গে উত্তরার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। তাঁর অভিযোগ, ছোট ছেলে ও পুত্রবধূ তাঁকে নিজ বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতি ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে বাড়িতে ফিরতে বাধা দিচ্ছেন।
ভুক্তভোগী বৃদ্ধ এম মো. আলী জানান, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি বাড়িটি নির্মাণ করেন। পাশাপাশি একটি পোশাক কারখানাও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়।
বাড়ি দখলের অভিযোগে আদালতের দ্বারস্থ
মো. আলীর দাবি, তাঁর ছোট ছেলে এম এম মাহমুদ সাঈদ বর্তমানে ওই বাড়ির নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন। গত বছরের মে মাসে তিনি আদালতে মামলা করে অভিযোগ করেন, ছেলে ও পুত্রবধূ তাঁকে জোরপূর্বক বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন।
মামলায় উল্লেখ করা হয়, একপর্যায়ে গলায় ছুরি ধরে তাঁকে বাসা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এরপর বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিলেও সেখানে গিয়ে বা ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মো. আলী বলেন, তিনি এখন আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করছেন এবং নিরাপদে নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ চান।
দুই ছেলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
অভিযোগের বিষয়ে ছোট ছেলে এম এম মাহমুদ সাঈদ সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন।
তাঁর দাবি, তিন বছর আগে বাবা প্যারালাইজড হওয়ার পর বড় ভাই ওয়াহিদ যোবায়ের বাবাকে ভুল বুঝিয়ে পরিবারের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন।
মাহমুদ সাঈদের ভাষ্য, তিনি শুধু বাবার বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন এবং বাড়ির বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাট এখনো খালি রয়েছে।
এমনকি একটি ফ্ল্যাটের ভাড়াও তাঁর বাবা নিয়মিত গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে বড় ছেলে ওয়াহিদ যোবায়ের দাবি করেন, সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ছোট ভাই দীর্ঘদিন ধরে বাবার ওপর শারীরিক
ও মানসিক চাপ প্রয়োগ করছিলেন। বাবার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই তিনি তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছেন।
সম্পত্তি বিরোধে একাধিক মামলা
পারিবারিক এই বিরোধ শুধু বাবা-ছেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাড়ি ও ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে একাধিক মামলা হয়েছে।
একটি মামলায় মো. আলী তাঁর এক ভাড়াটিয়া এবং তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে বকেয়া ভাড়া ও হামলার অভিযোগ আনেন।
মামলাটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
অন্যদিকে ওই ভাড়াটিয়াও পরে বড় ছেলে ওয়াহিদ যোবায়েরের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
প্রথমে থানা পুলিশ অভিযোগের সত্যতা না পেলেও পরবর্তীতে পুনঃতদন্ত শেষে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়।
বৃদ্ধদের অধিকার ও সামাজিক বাস্তবতা
এই ঘটনা শুধু একটি পারিবারিক সম্পত্তি বিরোধ নয়; বরং দেশের অনেক প্রবীণ নাগরিকের নিরাপত্তা, ভরণপোষণ
এবং সম্মানজনক জীবনের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। আইন অনুযায়ী সন্তানদের ওপর পিতা-মাতার ভরণপোষণের দায়িত্ব থাকলেও
বাস্তবে অনেক প্রবীণ ব্যক্তি সম্পত্তি ও পারিবারিক বিরোধের কারণে অসহায় পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।
মিরপুরের এই ঘটনাটি পারিবারিক সম্পত্তি বিরোধের জটিল বাস্তবতা এবং প্রবীণদের নিরাপত্তাহীনতার একটি আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
একদিকে বৃদ্ধ বাবার বাড়ি দখল ও নির্যাতনের অভিযোগ, অন্যদিকে দুই ছেলের পাল্টাপাল্টি দাবি—সব মিলিয়ে বিষয়টির চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করবে
আদালত ও তদন্ত সংস্থার অনুসন্ধান। এই ঘটনা পরিবারে প্রবীণ সদস্যদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
