রক্ষক ভক্ষক হলে জনগণ সুফল পায় না বলে মন্তব্য করেছেন চরমোনাই পীর। বাজেট, দুর্নীতি ও জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে তুলে ধরেছেন নানা উদ্বেগ।
রক্ষক ভক্ষক হলে সুফল মেলে না: বাজেট ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে চরমোনাই পীরের সমালোচনা
দেশ পরিচালনায় দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যদি জনগণের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থে কাজ করেন, তাহলে রাষ্ট্র ও জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হয় বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম, যিনি চরমোনাই পীর নামে পরিচিত।
সোমবার (৮ জুন) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের আগামী অর্থবছরের বাজেট ও জনগণের প্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাজেট বাস্তবায়ন, দুর্নীতি, জনগণের অধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিকতা নিয়ে তিনি সরকারের প্রতি একাধিক প্রশ্ন ও উদ্বেগ তুলে ধরেন।
বাজেট জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে
চরমোনাই পীর বলেন, শুধুমাত্র বাজেট প্রণয়ন করলেই হবে না, এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, দেশের জনগণের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়নের পর্যায়ে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা না রাখে, তাহলে সেই বাজেটের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
তিনি বলেন, “জনগণের জন্য তৈরি বাজেট যদি জনগণের দোরগোড়ায় না পৌঁছায়, তাহলে এর বাস্তব সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।”
অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নের আহ্বান
বক্তব্যে তিনি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বর্তমান সরকারের উত্থান একটি বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্য দূর করা এবং মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা ছিল ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষার অনেকাংশ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি বলে তিনি মনে করেন।
দুর্নীতি ও জবাবদিহিতা নিয়ে কঠোর মন্তব্য
চরমোনাই পীর দেশের দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তারা জনগণের আমানত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত। কিন্তু দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যদি নিজেদের অবস্থানের অপব্যবহার করেন, তাহলে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, “রক্ষক যদি ভক্ষক হয়ে যায়, তখন সব আলোচনা টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে তার কোনো সুফল দেখা যায় না।”
তাঁর মতে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।
বৈদেশিক ঋণ নিয়ে উদ্বেগ
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বৈদেশিক ঋণের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা ভবিষ্যতে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিটি নাগরিক পরোক্ষভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের দায় বহন করছে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন।
শরিয়াহভিত্তিক নীতির পক্ষে মত
গোলটেবিল বৈঠকে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তাঁর মতে, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে মূল্যবোধভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শুধুমাত্র আলোচনা নয়, কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে।
গোলটেবিলে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সাবেক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, বিশ্লেষক ও সম্পাদক সোহরাব হাসান, বরগুনা-১ আসনের
সংসদ সদস্য মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ, ইসলামী আন্দোলনের আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা গোলাম মসীহ, জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য
সৈয়দ মুসাদ্দিক বিল্লাহ আল মাদানী এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্টজন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট বাস্তবায়ন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়ে চরমোনাই পীরের মন্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনায়
নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে জবাবদিহিতা ও সুশাসনের প্রশ্নে তাঁর বক্তব্য জনমনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
