কক্সবাজারের মাতামুহুরীতে গভীর রাতে জানালার গ্রিল কেটে প্রবাসীর ঘরে হানা দিল সশস্ত্র ডাকাত দল। লুটপাটের পাশাপাশি মা ও স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে নির্মম যৌন নির্যাতন।

উপকূলীয় জেলা কক্সবাজারের নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় এক ভয়াবহ ও নৃশংস অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। গভীর রাতে একটি রেমিট্যান্সযোদ্ধা তথা প্রবাসী পরিবারের বসতবাড়িতে হানা দিয়েছে একদল সশস্ত্র অপরাধী। ডাকাত দল কেবল ওই বাড়ির নগদ টাকা ও মূল্যবান অলঙ্কার লুট করেই ক্ষান্ত হয়নি, পরিবারের দুই নারী সদস্যের ওপর চালিয়েছে চরম অমানবিক ও পাশবিক নির্যাতন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে একজন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীও রয়েছে। এই বর্বরোচিত ঘটনায় ইতিমিধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপরতা শুরু করেছে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ছয়জন সন্দেহভাজনকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। গত সোমবার (৮ জুন) দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা ইউনিয়নের সিকদারপাড়া সংলগ্ন ডলনিরঘোনা এলাকায় এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে।
মধ্যরাতে জানালার গ্রিল কেটে ঘরে প্রবেশ
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা যায়,
সোমবার রাতের শেষ প্রহরে যখন সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই ৮ থেকে ১০ জনের একটি সুসংগঠিত এবং সশস্ত্র অপরাধী চক্র ওই প্রবাসীর বাড়িটি টার্গেট করে।
ডাকাত দলের সদস্যরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বাড়ির জানালার লোহার গ্রিল কেটে ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
ঘরে ঢুকেই তারা অস্ত্রের মুখে পরিবারের সবাইকে জিম্মি করে ফেলে। কোনো ধরনের চিৎকার বা প্রতিরোধের চেষ্টা করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আলমারি ও ড্রয়ার ভেঙে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, স্বর্ণের গহনা এবং মূল্যবান ইলেকট্রনিক সামগ্রী ব্যাগে ভরে নেয় ডাকাতরা।
লুটপাটের পর মা ও মেয়ের ওপর নৃশংস বর্বরতা
লুটপাট চালানো শেষে অপরাধীদের নৃশংসতা আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে।
ঘরে থাকা প্রবাসীর স্ত্রী এবং তাঁর স্কুলপড়ুয়া কিশোরী কন্যাকে আটকে রেখে পালাক্রমে সংঘবদ্ধভাবে যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী কিশোরীটি স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ডাকাত দলটি তাদের মিশন শেষ করে অন্ধকারেই এলাকা ছেড়ে চম্পট দেয়।
অপরাধীরা চলে যাওয়ার পর ভুক্তভোগীদের আর্তচিৎকারে আশেপাশের প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন এবং রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় মা-মেয়েকে উদ্ধার করেন।
হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন কিশোরী
ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা মারাত্মকভাবে আহত মা ও মেয়েকে উদ্ধার করে দ্রুত চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে
কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন।
বর্তমানে তারা কক্সবাজার সদর হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নির্যাতনের শিকার ওই স্কুলছাত্রীর শারীরিক আঘাত অত্যন্ত গুরুতর।
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং মানসিক ট্রমার কারণে তার অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত সংকটাপন্ন। চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (ICU) রেখে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা প্রদান করছেন।
“ডাকাতরা শুধু আমাদের ধন-সম্পদই কেড়ে নেয়নি, তারা আমার বোন আর ভাগ্নির জীবনটাকেও ধ্বংস করে দিয়েছে। ভাগ্নিটার অবস্থা খুবই খারাপ, আমরা এখন তার জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছি। আমরা এই জঘন্য অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
— সাইদুল ইসলাম মারুফ, ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অ্যাকশন: আটক ৬
এই রোমহর্ষক ও স্পর্শকাতর ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ।
অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ ইতিমধ্যেই বিশেষ অভিযান শুরু করেছে।
ঘটনার পর থেকে এলাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এ পর্যন্ত ছয়জনকে আটক করা হয়েছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং আলামত সংগ্রহ করেছেন।
স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে এবং এটি একটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার এই প্রত্যন্ত এলাকায় এমন লোমহর্ষক ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজ এলাকায় এমন দুঃসাহসিক ও জঘন্য অপরাধের ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
গ্রামীণ এলাকায় রাত্রিকালীন পুলিশি টহল আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে এই ঘটনার মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো অপরাধী চক্র এমন দুঃসাহস দেখানোর সাহস না পায়।
একটি প্রবাসী পরিবার যারা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন,
তাদের অনুপস্থিতিতে দেশে থাকা তাদের পরিবারের ওপর এমন বর্বর আক্রমণ দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর একটি বড় ধাক্কা।
শুধু মা-মেয়ের সম্ভ্রমহানি নয়, একটি সম্ভাবনাময় কিশোরী ছাত্রীর জীবন আজ মৃত্যুর মুখে।
দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ আশা করে, প্রশাসন দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করবে এবং প্রকৃত অপরাধীদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলাতে সক্ষম হবে।
