স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক সিরাজুল আলম খানের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে পালিত হচ্ছে স্মরণ কর্মসূচি।
সিরাজুল আলম খানের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ
স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠককে স্মরণ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক, স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের প্রধান উদ্যোক্তা এবং বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) বা মুজিব বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল আলম খানের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ (৯ জুন)। ২০২৩ সালের এই দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিবার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সিরাজুল আলম খান স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, স্মরণসভা এবং তাঁর রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবদান নিয়ে বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হচ্ছে। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর অবদান নতুন করে স্মরণ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক এবং বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
শৈশব ও রাজনৈতিক জীবনের সূচনা
১৯৪১ সালের ৬ জানুয়ারি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আলীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সিরাজুল আলম খান। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে স্নাতকোত্তর অধ্যয়নকালে ‘কনভোকেশন মুভমেন্ট’-এ অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়।
পরবর্তীতে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৬৩ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা গোপন রাজনৈতিক সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ বা ‘নিউক্লিয়াস’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি।
স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে সিরাজুল আলম খানের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার আন্দোলন এবং ১১ দফা আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ের ছাত্র আন্দোলন ও জনমত গঠনে তাঁর পরিকল্পনা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পেছনেও তাঁর রাজনৈতিক কৌশলের প্রভাব ছিল বলে মনে করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিউক্লিয়াসের রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তিতে গড়ে ওঠে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ),
যা পরবর্তীতে মুজিব বাহিনী নামে পরিচিতি লাভ করে। পাশাপাশি ‘জয় বাংলা বাহিনী’ নামে একটি বিশেষ সামরিক ইউনিটও গঠন করা হয়।
স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক পথচলা
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে
সিরাজুল আলম খানের মতপার্থক্য তৈরি হয়। বিশেষ করে বিপ্লবী জাতীয় সরকার গঠন প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল ভিন্ন।
এই মতভেদের ধারাবাহিকতায় তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), যা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত।
জাসদের মাধ্যমে তিনি বিকল্প রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা তুলে ধরেন।
রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিতি
সিরাজুল আলম খান শুধু রাজনৈতিক সংগঠকই ছিলেন না, বরং তিনি একজন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে তাঁর বিভিন্ন তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দেশ-বিদেশের গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ‘রহস্যপুরুষ’ নামেও পরিচিত ছিলেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি প্রচারের আড়ালে থেকে নীতিনির্ধারণী চিন্তা ও কৌশল প্রণয়নে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন।
স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা
তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন তাঁর অবদান স্মরণ করে বলছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম
এবং রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে সিরাজুল আলম খানের নাম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
স্বাধীনতা আন্দোলনের নেপথ্যের অন্যতম কারিগর হিসেবে তাঁর অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের মূল্যবান অংশ হয়ে থাকবে।
