কুষ্টিয়ার লালন মাজারে অনৈতিকতা ও মাদকের অভিযোগ তুলে সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন জামায়াত এমপি। এ নিয়ে দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও অসাম্প্রদায়িক মহলে উদ্বেগ।
বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি, সুফি দর্শন এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্যতম প্রধান বাতিঘর হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত কুষ্টিয়ার ছেনুরিয়ার লালন সাঁইয়ের মাজার ও আশ্রম। যুগ যুগ ধরে এই স্থানটি জাত-পাত ও ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে মানুষের আত্মিক মিলনের এক পবিত্র কেন্দ্র হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। তবে অতি সম্প্রতি দেশের এই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটিকে ঘিরে জাতীয় সংসদে এক নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে, যা সাংস্কৃতিক ও অসাম্প্রদায়িক মহলে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।সংসদের সাম্প্রতিক এক অধিবেশনে কুষ্টিয়া অঞ্চল থেকে নির্বাচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) আমির হামজা লালন মাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য এবং এর পূর্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজারগুলোতে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে এক অস্থিরতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সংসদে জামায়াত এমপির অভিযোগ ও প্রশাসনের প্রতি দাবি
বুধবার জাতীয় সংসদের নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর ও আলোচনা পর্বে অংশ নিয়ে কুষ্টিয়ার জামায়াত এমপি আমির হামজা সরাসরি লালন মাজার ও আশ্রমের দিকে আঙুল তোলেন।
তিনি তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন,
সংস্কৃতির বিকাশ এবং গান-বাজনার নামে লালন মাজারে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রকাশ্য মাদকের কারবার পরিচালিত হয়ে আসছে।
তিনি উষ্মা প্রকাশ করে বলেন,
বাউল সম্রাট লালন শাহের আধ্যাত্মিকতার দোহাই দিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ সেখানে সমাজবিরোধী কার্যকলাপকে প্রশ্রয় দিচ্ছে,
যা স্থানীয় যুবসমাজ ও সামাজিক কাঠামোর জন্য এক বিশাল হুমকি।
লালন মাজার ও এর আশেপাশের সংলগ্ন এলাকাকে সম্পূর্ণরূপে মাদকমুক্ত এবং অনৈতিকতা থেকে রক্ষা করতে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেন।
সংস্কৃতিমন্ত্রীর জবাব: গোটা দেশকে মাদকমুক্ত করার প্রত্যয়
জামায়াত এমপির এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে মঞ্চে দাঁড়ান সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
তিনি লালন মাজারকে কেন্দ্র করে সুনির্দিষ্ট কোনো নেতিবাচক মন্তব্য না করে বিষয়টিকে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেন।
সংস্কৃতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, সরকার কেবল লালন মাজার বা কোনো নির্দিষ্ট একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকেই নয়,
বরং পুরো বাংলাদেশকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করতে বদ্ধপরিকর।
যেকোনো পবিত্র বা সাংস্কৃতিক স্থানে মাদকের অনৈতিক অনুপ্রবেশ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
তবে সংস্কৃতির চর্চা এবং বাউল দর্শনের যে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রয়েছে,
সেটির সুরক্ষা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
মিরপুর শাহ আলী মাজারের সেই নির্মম হামলা: একটি অতীত খতিয়ান
সংসদে লালন মাজারকে নিয়ে এই বক্তব্য আসার পর সচেতন নাগরিক সমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা আতঙ্কের সাথে বিগত দিনের কিছু ঘটনা স্মরণ করছেন।
তাদের মতে, মাদকের কারবার বা অনৈতিকতার ওজুহাত তুলেই অতীতে দেশের বহু সুফি আস্তানায় আঘাত হানা হয়েছে।
যার অন্যতম বড় উদাহরণ হলো, মাস খানেক আগে রাজধানী ঢাকার মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী শাহ আলী মাজারে ঘটে যাওয়া এক বেপরোয়া হামলা।
মাজারটিতে যখন বাৎসরিক ওরস শরীফ চলছিল, তখন ‘মাদকের আখড়া’ উচ্ছেদের ধুয়া তুলে একদল উগ্রপন্থী পুলিশের উপস্থিতিতেই সাধারণ ভক্তদের ওপর চড়াও হয়। এই বর্বরোচিত হামলায় অন্তত ৫০ জন গুরুতর জখম হন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র প্রতিবাদের মুখে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পরবর্তীতে তিন জন জামায়াত কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হলেও, সেই মামলার তদন্ত পরবর্তীতে অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কুমিল্লার হোমনা এবং মাজার ভাঙচুরের ধারাবাহিকতা
মাজার ও সুফিবাদের আস্তানায় এই ধরণের হামলার চিত্র কেবল রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নয়।
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যভাগে কুমিল্লার হোমনা উপজেলায় এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
সেখানে কথিত ধর্ম অবমাননার কাল্পনিক অভিযোগ তুলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি এবং স্থানীয় চারটি প্রাচীন মাজারে একযোগে হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
একটি চিহ্নিত মৌলবাদী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠী এই পুরো ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল,
যা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বড় ধরণের ধাক্কা দেয়।
সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের মত:
সুফি সাধকদের আস্তানা বা লালন সাঁইয়ের আখড়া কেবল কোনো ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এগুলো এদেশের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য। মাদক বা অনৈতিকতার ওজুহাত তুলে যদি এই কেন্দ্রগুলোকে বিতর্কিত করা হয়, তবে তা পরোক্ষভাবে চরমপন্থাকে উস্কে দেওয়ার শামিল।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাজার, দরবার শরীফ এবং বাউলদের সাধনপীঠে ধারাবাহিক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংস্থাটি তাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আসক তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে:
- মাজার-কেন্দ্রিক এই ধরণের প্রচ্ছন্ন হুমকি ও প্রকাশ্য হামলা বাংলাদেশের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিপন্থী।
- এগুলো দেশের সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মৌলিক মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
- অপরাধ দমনের নামে যেকোনো ঐতিহ্যবাহী স্থানে হামলা চালানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং রাষ্ট্রকে এই উগ্রবাদী তৎপরতা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
সংস্কৃতির সুরক্ষা ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
কুষ্টিয়ার লালন মাজারকে কেন্দ্র করে সংসদে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল মাদক নির্মূলের একটি সাধারণ দাবি নয়,
বরং এর পেছনে দেশের মৌলিক অসাম্প্রদায়িক কাঠামোর সুরক্ষার প্রশ্নটি জড়িত। লালন শাহের সাম্য ও মানবতার বাণী আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
কোনো স্থানে যদি মাদকের অপ্রীতিকর বিস্তার ঘটে, তবে তা দমন করার দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর;
কিন্তু তার ওজুহাতে একটি ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকে টার্গেট করা বা কালিমালিপ্ত করা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
সরকার ও প্রশাসনকে একদিকে যেমন যেকোনো ধরণের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শক্ত হাতে দমন করতে হবে, ঠিক তেমনি লালন মাজারের মতো অসাম্প্রদায়িক বাতিঘরগুলোর নিরাপত্তা ও ঐতিহ্য রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নিতে হবে।
তবেই রক্ষা পাবে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।
