চট্টগ্রাম মহানগর ও সাত জেলায় পুলিশের করা ‘শুটার’ তালিকার বাইরে রয়ে গেছে অন্তত ১৩৯ জন চিহ্নিত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। আড়ালে থাকা অপরাধীদের নিয়ে বিস্তারিত জানুন।
পুলিশি তালিকার হিসাব বনাম মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র
চলতি বছরের শুরুর দিকে অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার অংশ হিসেবে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ শাখা দেশব্যাপী অস্ত্রধারী ‘শুটারদের’ একটি তালিকা প্রণয়ন করে। এই তালিকায় চট্টগ্রাম মহানগর এবং সংশ্লিষ্ট সাতটি জেলার জন্য মোট ১০৯ জন ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। লক্ষ্য ছিল হত্যা, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত এসব অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা।
তবে স্বাধীন অনুসন্ধানে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের করা ১০৯ জনের এই তালিকা ছাড়াও কেবল চট্টগ্রাম মহানগর
এবং এই অঞ্চলের সাতটি জেলা মিলিয়ে আরও অন্তত ১৩৯ জন দুর্ধর্ষ অস্ত্রধারীর সন্ধান মিলেছে,
যাদের নাম রহস্যজনক কারণে প্রশাসনের এই তালিকায় স্থান পায়নি।
এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম মহানগর এলাকাতেই তালিকাভুক্ত শুটারের সংখ্যা মাত্র ৯ জন হলেও,
মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়ে অন্তত ৮৫ জন সক্রিয় অস্ত্রধারীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যারা প্রকাশ্যে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম মহানগরে তালিকাভুক্তির বাইরে থাকা অস্ত্রধারীদের দৌরাত্ম্য
চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন থানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,
অপরাধজগতের অনেক কুখ্যাত মুখ ও প্রকাশ্য অস্ত্রধারীর নাম পুলিশের বিশেষ শাখার এই তালিকায় ওঠেনি। উদাহরণস্বরূপ—
- শহীদুল ইসলাম: চুরি ও ছিনতাইয়ের মাধ্যমে অপরাধের দুনিয়ায় পা রাখা এই ব্যক্তি পরবর্তীতে মাদক ব্যবসা ও নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ২৩টিরও বেশি মামলা রয়েছে। পুলিশের তালিকায় তাঁর নাম থাকলেও তাঁর পুরো বাহিনী এবং সহযোগীরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে।
- ছোট সাজ্জাদ ও অন্যান্য: বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের নাম পুলিশের তৈরি মূল শুটার তালিকায় নেই। অথচ চাঁদা না পেয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করার একাধিক ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
- ইসমাইল হোসেন ওরফে টেম্পো: টেম্পো চালকের সহকারী থেকে অপরাধজগতের ত্রাস হয়ে ওঠা ইসমাইলের বিরুদ্ধে শিশু হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ প্রায় ৩০টি মামলা থাকলেও তাঁর নামও মূল তালিকায় অনুপস্থিত।
- জুলাই আন্দোলনের অস্ত্রধারীরা: ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর, বহদ্দারহাট ও নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে গুলি চালিয়ে যারা হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছিল, তাদের মধ্যে পুলিশ ভিডিও বিশ্লেষণ করে ৪৬ জনকে শনাক্ত করলেও তাঁদের কারও নামই এই ‘শুটার’ তালিকায় নেই।
বিভাগের বিভিন্ন জেলাতেও একই চিত্র: ফেনী, নোয়াখালী ও অন্যান্য জেলার অবস্থা
শুধু চট্টগ্রাম মহানগরী নয়, বিভাগের অধীনস্থ সাতটি জেলার (পার্বত্য তিন জেলা ও কক্সবাজার বাদে) চিত্রও প্রায় একই রকম হতাশাজনক।
- ফেনীর পরিস্থিতি: গত জুলাই অভ্যুত্থানের সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে নির্বিচারে গুলি চালানোর বহু ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। কিন্তু পুলিশের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফেনী জেলায় মাত্র ৫ জন অস্ত্রধারীর নাম রাখা হয়েছে। অথচ স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধানে অন্তত ৩৩ জন এমন ব্যক্তির তথ্য পাওয়া গেছে, যারা তৎকালীন সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর অনুসারী হিসেবে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করেছিল এবং ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালিয়েছিল।
- নোয়াখালীর চিত্র: কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় বসুরহাট পৌরসভার সাবেক মেয়র আবদুল কাদের মির্জার ক্যাডার বাহিনী হিসেবে পরিচিত একাধিক অস্ত্রধারীর নাম পুলিশের তালিকায় আসেনি। অথচ তাদের বিরুদ্ধে অতীতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও সাংবাদিক হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
- ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুর: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে গুলি করার ভিডিও ভাইরাল হওয়া শাকিল সিকদার ওরফে লায়ন কিংবা কুমিল্লার বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘাতে অস্ত্র ব্যবহারকারী বহু ক্যাডার এই তালিকার বাইরে রয়ে গেছে। লক্ষ্মীপুরে সাবেক মেয়রের ছেলের মতো প্রভাবশালী অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও প্রশাসনিক তালিকায় ঘাটতি রয়েছে।
রাজনৈতিক আশ্রয় ও অপরাধের পারম্পর্য
অনুসন্ধানে একটিবিষয় অত্যন্ত স্পষ্টহয়ে উঠেছে যে, এই অস্ত্রধারীদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে নিজেদের অপরাধ কর্মকাণ্ড টিকিয়ে রেখেছে।
অতীতে আওয়ামী লীগ বা এর অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তাদের কেউ কেউ ক্ষমতার পালাবদলে
নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে অন্য রাজনৈতিক দল বা নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছে।
অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, রাজনৈতিক আশ্রয় এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে এসব পেশাদার অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে।
ফলে অস্ত্রধারী, চাঁদাবাজ ও টেন্ডারবাজরা দিনের পর দিন আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞ মতামত ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা
পুলিশের এই অসম্পূর্ণ এবং ত্রুটিপূর্ণ তালিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন মন্তব্য করেছেন—
“তালিকা যদি শুরুতেই ভুল বা অসম্পূর্ণ হয়, তবে তা দিয়ে পরিচালিত আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এর ফলে মূল সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট অপরাধীরা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে। এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ তালিকা তৈরির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সুনির্দিষ্ট জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।”
অন্যদিকে, পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে
এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব তথ্য এবং পুলিশি তালিকার এই বিশাল ব্যবধান প্রমাণ করে যে
অপরাধ দমনের গতি আরও শাণিত করতে হলে তালিকা দ্রুত হালনাগাদ করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য।

- ছবি ১: চট্টগ্রাম নগরীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর টহল বা চেকপোস্টের একটি সাধারণ দৃশ্য।

- ছবি ২: অপরাধ দমনে পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কোনো বৈঠক বা সংবাদ সম্মেলনের ছবি।
একটি নিরাপদ ও শৃঙ্খলিত সমাজ গঠনে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং পেশাদার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের সমূলে উৎপাটন করা অত্যন্ত জরুরি।
চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভাগের সাত জেলায় পুলিশের করা ‘শুটার’ তালিকার বাইরে শতাধিক অস্ত্রধারীর উপস্থিতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে বড় এক অশনিসংকেত।
অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা নাকরে নিরপেক্ষ ও নিখুঁত তালিকা প্রস্তুতের মাধ্যমে যদি সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা না যায়,
তবে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
