যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা বন্ধের ঘোষণায় তেহরানও তাদের পাল্টা সামরিক অভিযান ও ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
তেহরানের ঘোষণা: হামলা বন্ধ তো অভিযানও বন্ধ
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিমান হামলা বন্ধ রাখার পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়ে ইরান সরকারও তাদের পাল্টা সামরিক তৎপরতা স্থগিত রাখার আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিষ্কার করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, অতীতে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রে নানামুখী বিশ্বাসঘাতকতা বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের রেকর্ড থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বার্তা আদান-প্রদান নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ইরানি প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র জানিয়েছে, তেহরানের নীতিগত অবস্থানে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। তাদের মূল নীতি অত্যন্ত পরিষ্কার—”পাল্টা আক্রমণের জবাব আক্রমণ দিয়েই দেওয়া হবে, তবে প্রতিপক্ষ যদি আগ্রাসন বা বিমান হামলা বন্ধ রাখে, তবে ইরানও সমপরিমাণে তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ রাখবে।” এই স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা ইতোমধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
টানা ১৩ রাতের পেন্টাগনের বিমান অভিযান ও যুদ্ধবিরতির সূচনা
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ ১৩টি রাত টানা ভয়াবহ বিমান অভিযান পরিচালনা করার পর গত শুক্রবার রাতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন হঠাৎ করেই তেহরানের ওপর হামলা স্থগিত করার নির্দেশ দেয়। এর সুফল হিসেবে শনিবার ও রবিবারে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন কোনো বিমান হামলা বা আগ্রাসনের খবর পাওয়া যায়নি। ঠিক একই সময়ে, মধ্যপ্রাচ্যের যেসব রাষ্ট্রে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাসমূহ অবস্থিত, সেগুলোতেও ইরানের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ড্রোন কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়নি।
জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ মার্কিন গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে জোরদার করার লক্ষ্যে এবং দুই দেশের মধ্যে অর্থপূর্ণ আলোচনার একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করার জন্যেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
মার্কিন নীতি পরিবর্তনের নেপথ্য কারণ: অস্ত্র সংকট ও কৌশলগত মূল্যায়ন
ওয়াশিংটনের এই হঠাৎ হামলা থামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে কেবল যে সদিচ্ছা কাজ করেছে তা নয়, এর পেছনে রয়েছে বাস্তবসম্মত কিছু সামরিক বাধ্যবাধকতা। হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে:
লক্ষ্যবস্তু সমাপ্তি: গত দুই সপ্তাহের দীর্ঘ ও তীব্র অভিযানে ইরানের নির্ধারিত সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুগুলোর অধিকাংশেরই ওপর সফল হামলা সম্পন্ন হয়েছে।
গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি: মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে গিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ইন্টারসেপ্টর এবং যুদ্ধাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
জেনারেল ড্যান কেইনের সতর্কবার্তা: জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বড় পরিসরে এই সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত করা বা পুনরায় শুরু করার নেতিবাচক ঝুঁকি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করেছিলেন।
তেহরানের সংশয়: এটি কি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নাকি কৌশলগত বিরতি?
যদিও মাঠপর্যায়ে অস্ত্রশস্ত্রের গর্জন সাময়িকভাবে থেমে গেছে, তবুও তেহরানের নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে
স্বস্তির চেয়ে সংশয় ও সন্দেহের মেঘই বেশি ঘনীভূত হয়েছে। ইরানের জ্যেষ্ঠ একটি সরকারি সূত্রের দাবি,
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্তকে তেহরান এখনই কোনো স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে মূল্যায়ন করছে না।
ইরানি মহলের একটি বড় অংশের ধারণা, এটি কোনো প্রকৃত যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নয়; এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্যএকটি ‘কৌশলগত বিরতি’ মাত্র।
নতুন কোনো ছক কষে বা রসদ সংগ্রহ করে তারা পুনরায় বড় কোনো আগ্রাসনে লিপ্ত হতে পারে—
এমন আশঙ্কা থেকেই তেহরান সম্পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি ও সতর্কতা বজায় রাখছে।
হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব
এই চলমান সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি।
এর মধ্য দিয়ে নৌ চলাচল ও তেল পরিবহনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরম রূপ ধারণ করেছিল।
সংঘাতের এক পর্যায়ে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ পানি লবণমুক্তকরণ বা ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে পাল্টা আঘাত হানে।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক পঞ্চমাংশ (২০%) এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়ে থাকে।
ফলে এই দুই পরাশক্তির সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক গভীর ও মারাত্মক অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছিল।
বর্তমানে উভয় পক্ষ সামরিক অভিযান স্থগিত রাখলেও তেহরানের একজন সাধারণ ব্যবসায়ী রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বলেন—
“দেশের আপামর জনসাধারণ এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। যুদ্ধ পুরোপুরি শেষও হচ্ছে না, আবার শান্তিও ফিরে আসছে না। এই ঝুলন্ত ও থমথমে পরিস্থিতি মানসিক দিক থেকে অত্যন্ত ক্লান্তিকর।”
ছবি ১: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা যুদ্ধজাহাজের একটি প্রতীকী ফাইল ছবি।
ছবি ২: তেহরানের শহুরে দৃশ্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি কনসেপচুয়াল গ্রাফিক্স বা ছবি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই পারস্পরিক হামলা স্থগিতের ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ববাসীকে সাময়িকভাবে স্বস্তিদিলেও ভূরাজনীতির ক্যানভাসে স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা এখনোঅনেক দূরে।
কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে উভয় পক্ষ বসতে রাজি হলেও মাঠের অবিশ্বাসের দেওয়াল এখনও পুরোপুরি ভেঙে যায়নি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা, এই সাময়িক সামরিক বিরতি যেন কেবল কৌশলগত সময়ক্ষেপণ না হয়ে
বরং মধ্যপ্রাচ্যে চিরস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়।