বিএনপিকে বাদ দিয়ে জামায়াত ও এনসিপিকে ক্ষমতায় বসানোর ফর্মুলা ছিল ড. ইউনূসের। এমন বিস্ফোরক দাবি করলেন বিএনপি নেতা রাশেদ খান।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভাবনীয় ও চাঞ্চল্যকর বিতর্কের জন্ম দিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা এবং বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান। রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় তিনি দাবি করেছেন যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সময়ে দেশের মূল ধারার রাজনৈতিক দল বিএনপিকে রাজনীতি ও ক্ষমতার মাঠ থেকে সম্পূর্ণ মাইনাস বা অপসারিত করার সুদূরপ্রসারী এক ফর্মুলা বা পরিকল্পনা সক্রিয় ছিল। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সেই নির্দিষ্ট ফর্মুলার আওতায় একটি বিশেষ রাজনৈতিক সিন্ডিকেট ও নতুন ধারার শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার নীল নকশা আঁকা হয়েছিল।
মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে ‘ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে বিভাজন নয়, ঐক্য’ শীর্ষক এই বিশেষ আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলের বিভিন্ন নেপথ্য ঘটনা এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে রাশেদ খান এই বিস্ফোরক মন্তব্যগুলো করেন। তার এই বক্তব্য প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে এবং টকশোতে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
ড. ইউনূসের প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা এবং রাজনৈতিক মূল্যায়ন
বক্তব্যের শুরুতেই রাশেদ খান নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ এবং দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৎকালীন প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি নিজের ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাবোধের বিষয়টি স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ড. ইউনূসের অবদান এবং ব্যক্তিগত ব্যক্তিত্বের প্রতি সম্মান রেখেই তিনি কিছু কাঠোর ও বাস্তবভিত্তিক রাজনৈতিক সত্য তুলে ধরতে বাধ্য হচ্ছেন। একজন ব্যক্তি হিসেবে ড. ইউনূসের অর্জিত খ্যাতির প্রতি পূর্ণ সম্মান বজায় রেখেই তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা ও ক্ষমতার পালাবদলের নেপথ্য কিছু গোপন কৌশল নিয়ে কথা বলেন।
তবে ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাবোধ থাকলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তিনি কোনো রাখঢাক রাখেননি। রাশেদ খানের মতে, ড. ইউনূসের মতো একজন বিশ্বমানের ব্যক্তিত্বের চারপাশে এমন কিছু সুবিধাভোগী ও উচ্চাভিলাষী চক্র সক্রিয় ছিল, যারা দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং একটি বিশেষ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তাদের এই উচ্চাভিলাষের কারণে গোটা দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চরম হুমকির মুখে পড়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
নির্বাচন দীর্ঘায়িত করা এবং ড. ইউনূসের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চেষ্টা
সভায় রাশেদ খান দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বেচ্ছায় বা স্বপ্রণোদিত হয়ে নির্ধারিত সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর বা অবাধ নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে ছিলেন না। তার সুনির্দিষ্ট ভাষ্য অনুযায়ী, ড. ইউনূসের মূল লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা এবং সাংবিধানিক রূপান্তরকে দীর্ঘায়িত করা। বিভিন্ন সময় সংস্কারের মোড়কে ক্ষমতা দীর্ঘ করার নানামুখী কৌশল নেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে যে ড. ইউনূস নিজে থেকেই ক্ষমতা ছেড়ে নির্বাচন দিয়েছেন। কিন্তু পর্দার পেছনের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। রাজনৈতিক চাপ, জনরোষ এবং মাঠপর্যায়ের কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমেই মূলত তাকে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথে হাঁটতে বাধ্য করা হয়েছিল। স্বেচ্ছায় নয়, বরং কঠোর বাস্তবতার চাপে পড়ে তাকে ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বিএনপিকে মাইনাস এবং জামায়াত-এনসিপিকে বসানোর ফর্মুলা
রাশেদ খানের বক্তব্যের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশটি ছিল বিএনপিকে রাজনীতি থেকে উৎখাত করার গোপন ফর্মুলা সংক্রান্ত অভিযোগ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ও দৃশ্যপট থেকে ছিটকে যাওয়ার পর দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি বিএনপিকেও যেকোনো মূল্যে মাঠছাড়া করার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছিল। এই ফর্মুলার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিএনপিকে মাইনাস করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং নতুন গড়ে ওঠা রাজনৈতিক শক্তি এনসিপিকে (National Citizens Party বা সমমনা কোনো শক্তি) রাষ্ট্রক্ষমতার মসনদে বসানো।
তিনি দাবি করেন, এই গোপন ফর্মুলা বাস্তবায়নের নেপথ্যে সরকারের ভেতরেরই কিছু অতি প্রভাবশালী ও নীতিনির্ধারক ব্যক্তি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। সরকারের ভেতরের ওই বিশেষ মহলটি থেকে তিনি নিজে অত্যন্ত বিশ্বস্ত সূত্রে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য এবং গোপন বার্তা পেয়েছিলেন বলে দাবি করেন। সেই সূত্র ধরেই তিনি আজ প্রকাশ্যে এই অভিযোগ জাতির সামনে তুলে ধরছেন।
নির্বাচন ঠেকাতে নানা ষড়যন্ত্রের খতিয়ান
আলোচনা সভায় রাশেদ খান আরও দাবি করেন যে, ক্ষমতা ভাগাভাগির এই সমীকরণে জামায়াতে ইসলামী
এবং এনসিপির মতো রাজনৈতিক দলগুলো শুরু থেকেই একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে ছিল না।
তাদের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান এমন ছিল যাতে দেশে কোনো কার্যকর গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হতে পারে।
এমনকি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব নয়—এমনকি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশে
কোনো ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দেওয়া হবেনা বলেও বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে একধরনের পরোক্ষ হুমকি ও অনমনীয় মনোভাব দেখানো হয়েছিল।
নির্বাচন বানচাল বা বিলম্বিত করার এই অপচেষ্টা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে চরমভাবে ব্যাহত করার এক গভীর চক্রান্ত ছিল
বলে তিনি মন্তব্য করেন। দেশের সাধারণ মানুষ যখন একটি নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকারের জন্য উন্মুখ হয়ে ছিল,
তখন এই ধরনের গোষ্ঠীগুলো নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।
নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের হুমকি সম্পূর্ণ অনৈতিক
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে রাশেদ খান সদ্য নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের
ষড়যন্ত্রের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার কোনো পেছনের দরজা দিয়ে বা অনৈতিক উপায়ে ক্ষমতায় আসেনি;
বরং এই সরকার দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রত্যক্ষ ও স্বতঃস্ফূর্ত ভোটের রায়ে বৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা লাভ করেছে।
জনগণের রায়ে প্রতিষ্ঠিত একটি নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে অহেতুক গণঅভ্যুত্থানের হুমকি দেওয়া বা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টাকরা সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং অগণতান্ত্রিক।
এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট সব মহলকে কঠোরভাবে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
জনগণের ভোটাধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দিতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানিয়ে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সমীকরণ
রাশেদ খানের এই বিস্ফোরক মন্তব্য ও অভিযোগের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে মেরুকরণ শুরু হয়েছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এই দাবির পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলের শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ
এবং ক্ষমতার নেপথ্য কুশীলবদের ভূমিকা নিয়ে আগামী দিনে আরও বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক ও আলোচনা ডালপালা মেলবে।
