দীর্ঘ ১৫ মাস যুক্তরাজ্যে ব্রেন টিউমারের চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন। বিমানবন্দরে ভক্তদের ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি।
প্রবাসের দীর্ঘ চিকিৎসা অধ্যায় শেষে স্বদেশে পা রাখলেন চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় মুখ
বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী দিনের উজ্জ্বল নক্ষত্র, নিবেদিতপ্রাণ অভিনয়শিল্পী এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ইলিয়াস কাঞ্চন দীর্ঘ পনেরো মাসের বেশি সময় প্রবাসে চিকিৎসা শেষে অবশেষে স্বদেশের মাটি স্পর্শ করেছেন। সোমবার (৩ আগস্ট) বিকেল ৫টা ১০ মিনিটের দিকে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে তিনি ঢাকায় অবতরণ করেন। তার এই প্রত্যাবর্তন দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন ও অগণিত ভক্তকুলের মাঝে এক দারুণ স্বস্তি ও আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিয়েছে। গত দেড় বছর ধরে দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন থাকার কারণে তাকে বড় পর্দা কিংবা সামাজিক কর্মকাণ্ডে দেখা যায়নি, যা তার অনুরাগীদের মনে এক ধরণের শূন্যতা তৈরি করেছিল।
বিমানবন্দরের ভিআইপি গেট দিয়ে যখন তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন, তখন সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের মুখেই কেবল হাসির ঝিলিক দেখা যায়নি, বরং এই প্রবীণ শিল্পীর চেহারায় ছিল এক ধরণের স্বস্তির অভিব্যক্তি। দীর্ঘ রোগভোগ এবং বিদেশ বিভূঁইয়ে কঠিন চিকিৎসাপর্ব কাটিয়ে নিজ মাতৃভূমিতে ফেরার অনুভূতি প্রকাশের সময় তিনি অত্যন্ত সংবরণ ও বিনয়ী ভঙ্গিতে দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন।
বিমানবন্দর প্রাঙ্গণে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া ও আবেগঘন মুহূর্ত
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সংবাদকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আমি সুস্থভাবে আমার প্রিয় দেশে ফিরে আসতে পেরেছি। দেশবাসীর কাছে আমি আন্তরিকভাবে দোয়া চাই, যেন সামনে পুরোপুরি সুস্থ জীবনযাপন করতে পারি। আমি নিজেও পরম করুণাময়ের কাছে সবার মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি।”
তার এই সংক্ষিপ্ত অথচ নাড়া দেওয়া বক্তব্যে ফুটে ওঠে দীর্ঘ সংগ্রামের ছাপ। দীর্ঘ দেড় বছর ধরে দেশের মাটি থেকে দূরে থেকে হাসপাতালের চার দেওয়ালের মাঝে কেটে যাওয়া দিনগুলো যে কতটা কঠিন ছিল, তা তার এই বাক্যের মাঝেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ সময় বিমানবন্দরে তার পরিবারের কিছু ঘনিষ্ট সদস্য ও চলচ্চিত্রের কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
প্রবাসে চিকিৎসার পেছনের গল্প: ব্রেন টিউমার ও লন্ডনের হাসপাতালে লড়াই
স্মরণ করা যেতে পারে, গত বছরের এপ্রিল মাসের দিকে হঠাৎ করেই গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা ধরা পড়ে এই গুণী অভিনেতার। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার মস্তিষ্কে ব্রেন টিউমার ধরা পড়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। লন্ডনের বিভিন্ন স্বনামধন্য হাসপাতালে শুরু হয় তার দীর্ঘ চিকিৎসাপর্ব। চিকিৎসার এই পুরো সময়টিতে হাসপাতালের পাশাপাশি তিনি লন্ডনে বসবাসরত তার মেয়ে ইমা ইসলামের বাসায় অবস্থান করে প্রয়োজনীয় পরিচর্যা লাভ করেন। পরিবারের সদস্যদের নিবিড় সান্নিধ্য এবং মানসিক সমর্থন তার এই কঠিন রোগ জয়ের যাত্রাকে অনেকটা সহজ করে তুলেছিল।
চিকিৎসা চলাকালীন গত বছরের আগস্ট মাসে লন্ডনের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে তার মস্তিষ্কে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসকরা টিউমারের একটি বড় অংশ সফলভাবে কেটে ফেলতে সক্ষম হলেও, মস্তিষ্কের সংবেদনশীল অংশের কারণে সম্পূর্ণ অংশ অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে বায়োপসি এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফলাফলে তার শরীরে ব্রেন ক্যান্সারের উপস্থিতি শনাক্ত হয়, যা পরিবার ও ভক্তদের জন্য ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক এক সংবাদ।
চিকিৎসার কঠিন ধাপ: কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশনের অভূতপূর্ব সংগ্রাম
অস্ত্রোপচারের পর শুরু হয় ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও দীর্ঘায়িত চিকিৎসা অধ্যায়। তার শারীরিক অবস্থার আপডেট দিতে গিয়ে ছেলে মিরাজুল মইন জয় গণমাধ্যমকে জানান যে, অস্ত্রোপচারের পরপরই তার ওপর দীর্ঘ দুই মাস ধরে একটানা রেডিয়েশন থেরাপি চালানো হয়। এরপর গত জুলাই মাসে তার সর্বশেষ কেমোথেরাপি সম্পন্ন করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ চিকিৎসার ফলস্বরূপ টিউমারটি আকারে অনেকটাই ছোট হয়ে এসেছে, যা এই মুহূর্তে তাদের পরিবারের জন্য সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক ও বড় একটি সুসংবাদ।
পারিবারিক সূত্রে আরো জানা যায়,
চিকিৎসার এই দীর্ঘ যাত্রায় তাকে প্রায় ১২ সপ্তাহের একটি নিবিড় কেমোথেরাপি কোর্সের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
এই সময়ে সপ্তাহের পাঁচ দিন করে তাকে নিয়মিত কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে, যার সংখ্যা সবমিলিয়ে প্রায় ৬০টিরও বেশি।
পরবর্তীতে আরো কয়েকটি ধাপে ওরাল থেরাপি গ্রহণের মাধ্যমে সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি চালানো হয়।
সবমিলিয়ে প্রায় একশটির কাছাকাছি কেমোথেরাপি ও থেরাপির ধকল সহ্যকরতে হয়েছে এই প্রবীণ শিল্পীকে, যা একজন সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং পরবর্তী কর্মপন্থা
চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে পরিবার জানিয়েছে যে, ইলিয়াস কাঞ্চন আগের তুলনায় বর্তমানে শারীরিক দিক থেকে যথেষ্ট সুস্থ ও ভালো আছেন।
তবে তার এই চিকিৎসাপর্ব এখানেই সমাপ্ত হচ্ছে না। টিউমারের পুরোপুরি নিরাময়
এবং পরবর্তী ঝুঁকি এড়াতে তাকে নির্দিষ্ট সময় পরপর পুনরায় দেশের বাইরে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
আপাতত চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি আগামী কিছু দিন নিজের দেশেই কাটাচ্ছেন এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকবেন।
দেশে অবস্থানকালেও তাকে নিয়মিত নির্দিষ্ট কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বাস্তব জীবনেও নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) আন্দোলনের মাধ্যমে
সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার লড়াইয়ে আমৃত্যু নিজেকে নিয়োজিত রাখা এই মানুষটির অসুস্থতার খবর দেশজুড়ে মানুষের মনে গভীর বেদনার সৃষ্টি করেছিল।
তার সুস্থ হয়ে ফিরে আসার এই সংবাদে সেই বেদনার মেঘ কিছুটা হলেও কাটতে শুরু করেছে।
বিনোদন জগতে কাঞ্চনের অবদান ও ভক্তদের প্রত্যাশা
ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে ইলিয়াস কাঞ্চন আশির ও নব্বইয়ের দশকে বহু ব্যবসাসফল ও মনস্তাত্ত্বিক ছবি উপহার দিয়েছেন।
সামাজিক ও পারিবারিক গল্পের চলচ্চিত্রে তার সাবলীল অভিনয় আজও দর্শকদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। শুধু রূপালী পর্দায় নয়,
বরং পর্দার পেছনের বাস্তব জীবনেও সড়ক দুর্ঘটনার মতো ভয়াবহ এক সামাজিক অভিশাপের বিরুদ্ধে দীর্ঘ তিন দশকের বেশি
সময় ধরে নিরলস আন্দোলন চালিয়ে অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছেছেন তিনি।
তার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি দেশের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছিল।
১৫ মাস পর তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল তার পরিবারের জন্যই নয়, বরং সমগ্র চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি ও তার অগণিত ভক্তদের জন্য এক দারুণ প্রাপ্তি।
দেশবাসীর আন্তরিক দোয়া এবং উন্নত চিকিৎসার বদৌলতে তিনি যেন শতভাগ সুস্থ হয়ে পুনরায় আমাদের মাঝে
স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসতে পারেন—এটাই এখন সবার একমাত্র প্রত্যাশা।
