রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেস্টুন প্রদর্শনী নিয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি: ছাত্রদল-শিবির রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
উত্তরের ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ক্যাম্পাস ফের এক উত্তপ্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়টির স্বাধীনতা স্মারক চত্বরে ছাত্রশিবির আয়োজিত একটি প্রদর্শনী ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শনীর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মাঝে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত সহিংসতায় উভয় সংগঠনের অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। ক্যাম্পাসের শান্ত পরিবেশ মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যথাযথ অনুমতি নিয়েই গত সোমবার সকাল থেকে স্বাধীনতা স্মারক মাঠে ‘জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ শীর্ষক বিশেষ একটি ডকুমেন্টারি এবং বিগত বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার ব্যানার ও এলইডি স্ক্রিনে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করে আসছিল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির। কিন্তু এই প্রদর্শনীর টানটান উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করে যখন সেখানে প্রদর্শিত একটি বিশেষ ফেস্টুন ছাত্রদলের দৃষ্টিগোচর হয়।
সংঘর্ষের নেপথ্য কারণ: বিতর্কিত ফেস্টুন ও মতবিরোধ
উভয় পক্ষের মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মূল সূত্রপাত ঘটে একটি ব্যানার বা ফেস্টুন ঘিরে। ছাত্রশিবিরের প্রদর্শনীতে রাখা একটি নির্দিষ্ট ফেস্টুনে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার হওয়া এবং অভিযুক্ত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী, মতিউর রহমান নিজামী, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, কাদের মোল্লা এবং বিতর্কিত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ছবি একসঙ্গে স্থান পেয়েছিল।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিএনপি নেতার ছবি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদের ছবির সঙ্গে একই ফ্রেমে উপস্থাপন করা রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। এই ফেস্টুন প্রদর্শনের তীব্র প্রতিবাদ জানাতে এবং অবিলম্বে সেটি সেখান থেকে অপসারণ করার দাবি নিয়ে সোমবার সন্ধ্যার ঠিক আগে, অর্থাৎ আনুমানিক সাড়ে সাতটার দিকে ছাত্রদলের একটি প্রতিনিধিদল অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়। আর ঠিক এখান থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে মোড় নিতে শুরু করে।
সংঘর্ষের ঘটনাবলির কালানুক্রমিক বিবরণ
| সময়কাল | ঘটনার বিবরণ | ফলাফল |
| সোমবার সকাল | প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে ছাত্রশিবিরের ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী শুরু | শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় ছিল |
| সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা | ফেস্টুন সরানোর দাবিতে ছাত্রদলের প্রোগ্রামস্থলে প্রবেশ | দুপক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও তীব্র বাকবিতণ্ডা |
| রাত্রিকালের সংঘাত | ইটপাটকেল নিক্ষেপ, চেয়ার ভাঙচুর ও লাঠিসোটা নিয়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া | উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী আহত |
রণক্ষেত্র স্বাধীনতা স্মারক মাঠ: চেয়ার ও ইটের ব্যবহার
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে, যখন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ফেস্টুনটি সরানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেন, তখন উভয় পক্ষের মধ্যবর্তী কথপোকথন বা তর্কে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। মুহূর্তের মাঝেই বাকবিতণ্ডা রূপ নেয় শারীরিক সংঘাতে। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে প্রথমে চেয়ার ও ইটপাটকেল ছোঁড়ার অভিযোগ ওঠে। এর জবাবে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরাও লাঠিসোটা ও দেশীয় বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে পাল্টা ধাওয়া দেয়।
স্বাধীনতা স্মারক মাঠ ও এর আশেপাশের চত্বরে দফায় দফায় চলা এই আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে পুরো ক্যাম্পাস এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। হঠাৎ এমন একটি সহিংস সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দিকবিদিকে ছুটোছুটি শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ ধরনের ছাত্ররাজনীতির সংঘাত শিক্ষার্থীদের মনে নতুন করে ভীতির সঞ্চার করেছে।
আহতদের নামের তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
এই ভয়াবহ ও আকস্মিক সংঘর্ষে উভয় সংগঠনের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ও সক্রিয় নেতাকর্মী গুরুতর জখম হয়েছেন। তাদের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে তারা হলেন:
- ছাত্রশিবির পক্ষ: বেরোবি শাখা শিবিরের সাবেক সভাপতি সোহেল রানা, বর্তমান সেক্রেটারি ইমরান খান সৌরভ, ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের ব্রাকসুর জিএস প্রার্থী মেহেদী হাসান, বাইতুল মাল সম্পাদক বাইজিদ শিকদার এবং মুরসালিন।
- ছাত্রদল পক্ষ: ছাত্রদল নেতা আশিকসহ উভয় দলের মোট অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী এই দফায় দফায় সংঘর্ষে রক্তাক্ত হন।
আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়েছে। অনেকের আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও কঠোর হুঁশিয়ারি
ক্যাম্পাসে এমন ন্যাক্কারজনক ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর পরই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতার তীব্র নিন্দা ও গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
উপাচার্য স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “যাঁরা এই সংঘর্ষে জড়িয়ে আহত হয়েছেন,
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা তাঁদের সুচিকিৎসার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা ও সহায়তা প্রদান করব।
আমরা এই ঘটনার সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করতে মাঠের সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও ক্লিপগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করব।
ফুটেজ দেখে যারাই এই সহিংসতার জন্য দায়ী বা উসকানিদাতা হিসেবে চিহ্নিত হবে,
তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কঠোর ও শাস্তিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ক্যাম্পাসে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না।”
সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া এবং বর্তমান পরিস্থিতি
এই ঘটনার পর থেকে পুরো বেরোবি ক্যাম্পাসে এক ধরনের থমথমে ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সাধারণ শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, ক্যাম্পাসকে সব ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘর্ষমুক্ত রেখে কেবল শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা।
কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে এই ধরনের রাজনৈতিক শক্তির আধিপত্য বিস্তারের লড়াই আবারও শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বড় ধরণের ধাক্কা দিয়েছে।
