নিজেকে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে সাবেক এমপির বাসায় চাঁদা দাবির মামলায় ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পিবিআই। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় পিআইবির তদন্তে নানা তথ্য।
সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদা দাবি: ৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটি কুচক্রী মহল বিভিন্ন পরিচয়ে ফায়দা লোটার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে একশ্রেণির সুবিধাবাদী লোক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তেমনি এক চাঞ্চল্যকর ও অপরাধমূলক ঘটনার তদন্ত শেষ করেছে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট পিবিআই। সাবেক এক সংসদ সদস্যের বাসভবনে গিয়ে তাঁকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এরপর মোটা অঙ্কের আর্থিক দাবি আদায়ের চেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
গুলশানের অভিজাত এলাকায় চাঞ্চল্যকর অভিযানের নেপথ্য
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ২০২৫ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে। তৎকালীন সময়ে নিজেদের ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে একটি চক্র তৎপর হয়ে ওঠে। সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহম্মেদের গুলশানের বাসভবনে এক রাতে হানা দেয় তারা। পুলিশ প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে প্রথমে তল্লাশি চালানো হয়। তবে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে না পেয়ে পুলিশ চলে গেলেও চক্রটি পিছু ছাড়েনি। সুকৌশলে তারা পুনরায় ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে এবং বাসার কর্তাকে নানা রকম হুমকি-ধমকি দিতে শুরু করে।
“রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে পুঁজি করে কেউ ব্যক্তিগত ফায়দা লুটতে চাইলে তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধী যেই হোক, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।”
৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং প্রথম কিস্তি আদায়
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, সাবেক সংসদ সদস্যের স্বামী সিদ্দিক আবু জাফরের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাঁকে পুলিশি গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হয়। চরম আতঙ্ক ও মানসিক চাপের মুখে পড়ে ভুক্তভোগী পরিবার প্রাথমিকভাবে ১০ লাখ টাকা দিতে বাধ্য হয়। বাকি চল্লিশ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছিল। পুরো ঘটনাটির কিছু ভিডিও ফুটেজ ও দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করেছে তদন্তকারী কর্মকর্তা। টাকার লোভে অন্ধ হয়ে অপরাধীরা পরবর্তীতে আরও বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে।
টাকা নিতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ার নাটকীয় মুহূর্ত
চক্রের প্রধান অভিযুক্তদের লোভ এতই প্রবল ছিল যে তারা বাকি টাকা নেওয়ার জন্য আবার ওই ঠিকানায় হাজির হয়। ২৬ জুলাই বিকেলে নির্ধারিত ৪০ লাখ টাকা সংগ্রহ করতে গেলে সিকিউরিটি গার্ড বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করেন। গুলশান থানার পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছে হাতেনাতে অভিযুক্তদের আটক করে। তবে মূল অভিযুক্তদের কেউ কেউ তখন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। পরবর্তীতে গোয়েন্দা সংস্থার সার্বিক সহায়তায় ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে একে একে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়।
পিবিআইয়ের নিবিড় তদন্ত এবং অভিযোগপত্র দাখিল
মামলাটির প্রাথমিক তদন্ত গুলশান থানা সম্পন্ন করলেও পরবর্তীতে এর ভার ন্যস্ত হয় পিবিআইয়ের ওপর।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের এসআই ফিরোজ আহম্মেদ দীর্ঘ তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।
মোট ছয়জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
অভিযুক্তদের মধ্যে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার বিচার শিশু আদালতে সম্পন্ন হবে।
দীর্ঘ জেরা ও সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের পর এই অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়।
আদালতে আসামিদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি ও চাঞ্চল্যকর তথ্য
গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রধান অভিযুক্ত আবদুর রাজ্জাক রিয়াদ ও জানে আলম অপু আদালতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেন।
তাঁরা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
রিয়াদ নিজেকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের নেতা হিসেবে দাবি করে বলেন যে তিনি লোভ সামলাতে পারেননি।
অন্যদিকে, অপু জানান যে চাঁদার টাকা ভাগবাটোয়ারা করে তিনি একটি নতুন মোটরসাইকেল ক্রয় করেছেন।
আইফোনসহ বিভিন্ন দামি গ্যাজেট কেনার তথ্যও বেরিয়ে এসেছে তাঁদের স্বীকারোক্তিতে।
আইনি প্রক্রিয়া এবং ভুক্তভোগী পক্ষের প্রত্যাশা
বর্তমানে অভিযুক্ত ছয়জন আসামিই জামিনে মুক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
গামী ১০ নভেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আশা প্রকাশ করেছেন যে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করবেন।
ভুক্তভোগী পরিবারও ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য আদালতের দিকে তাকিয়ে আছে।
এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সমাজের তরুণ সমাজ ও সৎ আন্দোলনের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
