২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে চালানো গ্রেনেড হামলা শুধু আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা নয়, ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত জঙ্গি-রাজনীতির ভয়ঙ্কর উদাহরণ। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে পরিকল্পনা, ভুয়া আসামি বানানোর কাহিনি এবং বিএনপি-জামাত সরকারের ভূমিকা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট এক কালো অধ্যায়। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে চালানো গ্রেনেড হামলা শুধু শেখ হাসিনাকে হত্যার প্রচেষ্টা ছিল না—এটি ছিল গোটা আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার পরিকল্পিত নীলনকশা। মাত্র দেড় মিনিটের ব্যবধানে ১১টি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়, নিহত হন আইভি রহমানসহ ২৪ জন, আহত শতাধিক। কিন্তু এর থেকেও ভয়াবহ ছিল হামলার পরবর্তী রাষ্ট্রীয় ভূমিকা—নিরাপত্তা সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা, ভুয়া আসামি বানানোর নাটক, আর তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা।
২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শুরু হয় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, আর দেশব্যাপী জঙ্গি তৎপরতা।

বাংলাভাই, শায়খ আব্দুর রহমান থেকে শুরু করে মুফতি হান্নান—সবাই তখনকার শাসকদলের ছত্রছায়ায় ত্রাস কায়েম করছিল।
২০০৪ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট হাওয়া ভবনে বৈঠকে অংশ নেন লুৎফুজ্জামান বাবর, আব্দুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, জামায়াত নেতা আলী আহসান মুজাহিদ, এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংযোগযুক্ত মাজেদ ভাট।
সেখানে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনায় ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দেন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান।

পাকিস্তান থেকে আনা মিলিটারি-গ্রেড গ্রেনেড এ হামলার জন্য ব্যবহার করা হয়।
হামলার পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা যখন রক্তাক্ত সহযোদ্ধাদের রিকশা-অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিচ্ছিলেন, তখন পুলিশ সাহায্য না করে বরং লাঠিচার্জ চালায়।
আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়নি, মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়।
এরপর শুরু হয় ভয়াবহ ষড়যন্ত্র—
শৈবাল সাহা পার্থ নাটক: একজন নিরীহ হিন্দু যুবককে গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত দেখাতে নির্যাতন করে সাজানো স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়।
জজ মিয়া নাটক: দরিদ্র যুবক জজ মিয়াকে হামলার মূল আসামি বানিয়ে তার পরিবারের ভরণপোষণের লোভ দেখানো হয় এবং রিমান্ডে নির্যাতন করে মিথ্যা জবানবন্দি নেওয়া হয়।
প্রমাণ নষ্ট: বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পরিষ্কার করে আলামত নষ্ট করা হয়।

বিদেশি তদন্ত সংস্থাকেও ভুয়া তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়।
বিএনপি-জামাত সরকার এমনকি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে দাবি করে—এ হামলা আওয়ামী লীগের নিজের পরিকল্পনা, যাতে সহানুভূতি অর্জন করা যায়!
২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে মামলার পুনঃতদন্ত শুরু হলে বেরিয়ে আসে প্রকৃত পরিকল্পনাকারীদের নাম—হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান, আব্দুস সালাম পিন্টু, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাবর, আর হাওয়া ভবনের গডফাদার তারেক রহমান।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্তে স্পষ্ট হয়—রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়া এ হামলা সম্ভব ছিল না।
পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই, জামায়াত-বিএনপি নেতাদের যোগসাজশ এবং জঙ্গি সংগঠনগুলোর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এই হামলার সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল।
২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে।
মৃত্যুদণ্ড: সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জন।
যাবজ্জীবন: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, হারিস চৌধুরীসহ ১৯ জন।
এ রায়ে প্রমাণিত হয়—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন জঙ্গি হামলা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞ।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্রের নগ্ন উদাহরণ।
শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে চিরতরে ক্ষমতার বাইরে রাখার জন্য এ হামলা চালানো হয়েছিল।
কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে—সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া যায় না।
আজও শহীদদের রক্তের আহ্বান গণতন্ত্রকে দৃঢ় রাখার অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।
