চট্টগ্রামে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছেন সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ। নিরাপত্তা নাকি ভয় সৃষ্টির কৌশল?
চট্টগ্রাম | ৫ নভেম্বর ২০২৫:
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজ শহরে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে “দেখামাত্র গুলির নির্দেশ” জারি করেছেন। মঙ্গলবার দুপুরে ওয়্যারলেস সেটে দেওয়া মৌখিক আদেশে তিনি টহল ও থানা পুলিশকে জানিয়েছেন— “অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী কয়েকটাকে যদি মেরে ফেলতে হয়, মেরে ফেলব। চট্টগ্রামকে আর অন্ধকার যুগে ফিরতে দেব না।”
সিএমপির সর্বশেষ নির্দেশনা: ব্রাশফায়ার মোডে অভিযান
সূত্র জানায়, মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে কমিশনার ওয়্যারলেসে বারবার বার্তা দেন।
তিনি বলেন —“শটগান হবে না, চায়না রাইফেলও বাদ। এখন এসএমজি থাকবে ব্রাশফায়ার মুডে।”
পুলিশের টহল টিমকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এসএমজি ছাড়াও শিশা শটগান, গ্যাসগান ও ৯এমএম পিস্তল বহন করতে।
সাথে, চেকপোস্ট ৭টি থেকে বাড়িয়ে ১৩টি করা হয়েছে।
অস্ত্রধারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে “দণ্ডবিধি ৯৬ থেকে ১০৬” ধারার অধীনে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কমিশনার বলেন,
“সব দায় আমি নেব। কেউ ভয় পাবেন না।”
পটভূমি: সন্ত্রাসী হামলা ও নির্বাচনী উত্তেজনা
এই নির্দেশের আগে, ৫ নভেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী এলাকায়
বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা।
একই ঘটনায় এরশাদ উল্লাহ নিজেও গুলিবিদ্ধ হন।
পরের দিনও একই এলাকায় গুলির ঘটনা ঘটে,
যা চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
পুলিশ সূত্র জানায়, এই ঘটনার পরই কমিশনার “শূন্য সহনশীলতা নীতি” ঘোষণা করেন।
বিশ্লেষণ: এটি কি ন্যায্য আত্মরক্ষা, না নতুন বিতর্কের সূচনা?
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন,
কমিশনারের এই নির্দেশ “সন্ত্রাস দমন”–এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৯৬–১০৬ ধারায় আত্মরক্ষার অধিকার থাকলেও,
সেটি “তাৎক্ষণিক প্রাণঘাতী বিপদের ক্ষেত্রে” প্রযোজ্য —
“সর্বজনীন গুলির নির্দেশ” নয়।
একজন প্রাক্তন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন —
“ওয়্যারলেস বার্তা মাধ্যমে ব্রাশফায়ার নির্দেশ দেওয়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
এটি যদি অপব্যবহার হয়, তাহলে দায়ভার পুরো বাহিনী বহন করতে হবে।”
আগের নজির ও বিতর্ক
এমন নির্দেশ নতুন নয়।
২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট আওয়ামী লীগের মিছিল চলাকালে বন্দর থানার এক কর্মকর্তা আহত হওয়ার পর
কমিশনার হাসিব আজিজ “দেখামাত্র গুলির” অনুরূপ নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তখন সেই বার্তা ফাঁস হওয়ার ঘটনায় অমি দাশ নামে এক পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তার বিরুদ্ধে “বিনা অনুমতিতে ভিডিও রেকর্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর” অভিযোগে মামলা হয়েছিল।
জনমত ও প্রতিক্রিয়া
চট্টগ্রামবাসীর একাংশ মনে করছে,
এই নির্দেশে শহরে হয়তো তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা বাড়বে,
তবে একইসাথে আইনি জবাবদিহির সীমারেখা ঝুঁকিতে পড়বে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি—
“যেকোনো অভিযানে পুলিশকে অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় রাখতে হবে,
নইলে এ ধরনের নির্দেশ ভয় ও নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।”
সংক্ষিপ্ত সার:
চট্টগ্রামে সন্ত্রাস দমন অভিযানের নামে ব্রাশফায়ার নির্দেশ এখন নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এটি কি জননিরাপত্তার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, না কি আইনবহির্ভূত শক্তি প্রয়োগের সূচনা —
এটাই এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
রেফারেন্স:
- বাংলা ট্রিবিউন – চট্টগ্রামে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ
- প্রথম আলো – অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান সিএমপি’র
- ডেইলি স্টার – CMP Commissioner orders shoot-on-sight
