যুক্তরাষ্ট্রের ১% শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে হাজার কোটির বিমান ও জ্বালানি ক্রয়ের চুক্তি করল ইউনুস প্রশাসন। এই সিদ্ধান্ত ও দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে পড়ুন বিস্তারিত।
ঢাকা, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ চুক্তিতে পৌঁছাল ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন। তবে এই চুক্তির ফলাফল নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে বইছে সমালোচনার ঝড়। নামমাত্র ১% শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানির যে প্রতিশ্রুতি ঢাকা দিয়েছে, তাকে অনেক বিশেষজ্ঞই ‘অসম চুক্তি’ এবং ‘চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
রপ্তানি খাতে বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য মার্কিন বাজারে সুবিধা পাওয়ার আশায় এই চুক্তি করা হলেও, চূড়ান্ত হিসেবে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের জন্য ট্যাক্সের বোঝা এখনো পাহাড় সমান।
১% শুল্ক ছাড়: প্রাপ্তি বনাম প্রত্যাশা
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ধার্যকৃত অতিরিক্ত ২০% ট্যারিফ কমিয়ে ১৯% করেছে। তবে আগে থেকেই বিদ্যমান ১৫% ট্যারিফ বহাল থাকায় এখন মোট ট্যাক্স দাঁড়িয়েছে ৩৪%। রপ্তানিকারকদের প্রত্যাশা ছিল শুল্ক সুবিধা উল্লেখযোগ্য হারে কমবে, যাতে ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায়। কিন্তু মাত্র ১% কমানোর বিনিময়ে বাংলাদেশকে যে পরিমাণ আর্থিক দায়বদ্ধতা নিতে হয়েছে, তা বিস্ময়কর।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ৩৪% ট্যাক্স মাথায় নিয়ে মার্কিন বাজারে প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রায় অসম্ভব। যেখানে এই ছাড়ের বিনিময়ে বাংলাদেশকে বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার নিশ্চয়তা দিতে হয়েছে।
বোয়িং থেকে এলএনজি: বিশাল খরচের খতিয়ান
চুক্তির আওতায় প্রথম ধাপে মার্কিন কোম্পানি বোয়িং থেকে ১৪টি বিমান কেনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৩৫,০০০ কোটি টাকা। এখানেই শেষ নয়, পরবর্তী ধাপে আরও ১১টি বিমানসহ মোট ২৫টি বিমানের জন্য প্রায় ৫৩,০০০ কোটি টাকা খরচ করবে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আর্থিক সংকটের মধ্যে এত বড় বিনিয়োগ কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জ্বালানি খাতেও এসেছে বড় ঘোষণা। এক্সেলারেট এনার্জি থেকে আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার এলএনজি ক্রয়ের চুক্তি করেছে সরকার। ২০২৬ সাল থেকে প্রতি বছর ০.৮৫ থেকে ১ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করা হবে। অভিযোগ রয়েছে, বাজারমূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে এই জ্বালানি কেনার চুক্তি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল চাপ সৃষ্টি করবে।
খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকি?
চুক্তির শর্ত মেনে আগামী ৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৫ লক্ষ টন গম কিনবে বাংলাদেশ। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই গম কেনা হচ্ছে বাজারমূল্যের চেয়ে প্রায় দেড়গুণ বেশি দামে।
খাদ্য নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এই উচ্চমূল্যে গম ক্রয়কে সরকারি তহবিলের অপচয় হিসেবে দেখছেন সমালোচকরা।
এনডিএ এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব
এই চুক্তির অন্যতম বিতর্কিত দিক হলো নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (NDA)। সূত্রের খবর অনুযায়ী, চুক্তির অনেক স্পর্শকাতর তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি।
সমালোচকদের দাবি, এই এনডিএ স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যাদের মূল কাজ নির্বাচন আয়োজন করা, তারা কীভাবে এত বড় দীর্ঘমেয়াদী এবং গোপনীয় অর্থনৈতিক চুক্তি করতে পারে—সেই প্রশ্ন এখন তুঙ্গে।
শ্রম আইন ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে বাংলাদেশে শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে।
এখন থেকে কলকারখানা এমনকি এক্সপোর্ট প্রসিং জোনগুলোতেও (ইপিজেড) শ্রমিক সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজ করা হয়েছে।
যদিও এটি শ্রমিক অধিকারের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবে টাইমিং নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন উদ্যোক্তারা।
তাদের মতে, এটি অধিকারের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকারের বহিঃপ্রকাশ।
গার্মেন্টস মালিকদের আশঙ্কা, এর ফলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে অস্থিরতা বাড়তে পারে যা রপ্তানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও নির্বাচনের আগে অস্থিরতা
আসন্ন নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এমন বিশাল আর্থিক লেনদেনের চুক্তিকে ‘অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা।
তাদের মতে, জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া ১৫-২০ বছরের মেয়াদী কোনো চুক্তি করার নৈতিক অধিকার এই প্রশাসনের নেই।
অন্যদিকে, সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করছেন এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করবে।
তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন—মাত্র ১% শুল্ক ছাড় কি ৫৩ হাজার কোটি টাকার বিমান আর ১ লক্ষ কোটি টাকার গ্যাসের বিনিময়ে যথেষ্ট?
| খাতের নাম | চুক্তির বিবরণ | সম্ভাব্য খরচ (কোটি টাকা) |
| বিমান (বোয়িং) | ২৫টি নতুন বিমান ক্রয় | ৫৩,০০০ কোটি |
| জ্বালানি (এলএনজি) | ১৫ বছরে ১৫ মিলিয়ন টন এলএনজি | ১,০০,০০০ কোটি |
| খাদ্য (গম) | ৫ বছরে ৩৫ লক্ষ টন (দেড়গুণ দামে) | বাজারমূল্যের অতিরিক্ত ২০-৩০% |
| শুল্ক (ট্যারিফ) | ২০% থেকে কমিয়ে ১৯% | নীট ট্যাক্স ৩৪% বহাল |
উপসংহার: ড. ইউনুস প্রশাসনের এই ‘ডিপ্লোম্যাটিক জুয়া’ শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য সুফল আনবে নাকি ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেবে, তা সময়ই বলে দেবে।
তবে ৩৪% শুল্কের বাধা টপকে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত কতটুকু লাভবান হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েই গেল।
