তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দাবি করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোনো সাংবাদিক জেলে যাননি। তবে আসকের প্রতিবেদনে ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতনের তথ্য মিলেছে।
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে দাবি করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কেবল মত প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিককে কারাবরণ করতে হয়নি। তবে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং পেশাদার সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বর্তমানে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে।
উপদেষ্টার দাবি বনাম আসকের বার্ষিক প্রতিবেদন
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, সরকার কোনো সাংবাদিককে তাদের মত প্রকাশের জন্য হয়রানি করেনি। তিনি প্রশ্ন রাখেন, “যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে, উদাহরণ দিন।” তবে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের তথ্যমতে, গত এক বছরে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্তত ৩৮১ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।
নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান
আসকের তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে:
- নিহত হয়েছেন: ৩ জন সাংবাদিক।
- রহস্যজনক মৃত্যু: ৪ জন সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
- সরাসরি হামলা: ১১৮ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন।
- প্রাণনাশের হুমকি: অন্তত ২০ জন সাংবাদিককে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
- মামলার মুখোমুখি: প্রকাশিত সংবাদের জেরে মামলা হয়েছে ১২৩ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে।
কারাগারে দীর্ঘদিনের বন্দিজীবন ও ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’
তথ্য উপদেষ্টা দাবি করলেও বাস্তবে অনেক প্রবীণ ও পরিচিত সাংবাদিক বর্তমানে কারাগারে বন্দি রয়েছেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, প্রবীণ সাংবাদিক আনিস আলমগীর এবং মনজুরুল আলম পান্নাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টকশোতে সরকারের সমালোচনা করায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ ব্যবহার করা হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এছাড়া দীর্ঘ ১৬ মাসের বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন:
- শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রুপা (সাবেক একাত্তর টিভি)
- মোজাম্মেল বাবু (একাত্তর টিভি)
- শ্যামল দত্ত (ভোরের কাগজ)
তাদেরকে একাধিক হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। নিম্ন আদালতে বারবার জামিন আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত তাদের মুক্তি মেলেনি। সমালোচকরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই ঢালাও হত্যা মামলায় সাংবাদিকদের দিনের পর দিন আটকে রাখা ‘পাপের প্রায়শ্চিত্ত’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় নিপীড়ন
আসকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয়—উভয় পক্ষ থেকেই নিপীড়ন চালানো হয়েছে। বিশেষ করে ডিসেম্বরে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে নজিরবিহীন হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা দেশের ইতিহাসে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এক বড় আঘাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
| বিবরণ | সংখ্যা |
| মোট নির্যাতন/হয়রানি | ৩৮১ জন |
| হত্যাকাণ্ডের শিকার | ৩ জন |
| সরাসরি হামলা | ১১৮ জন |
| মামলার সম্মুখীন | ১২৩ জন |
| প্রাণনাশের হুমকি | ২০ জন |
উপসংহার
তথ্য উপদেষ্টা যখন সফলতার দাবি করছেন, তখন আসকের প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা বা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত নিপীড়ন নয়, বরং এটি পুরো গণতন্ত্রের জন্যই হুমকিস্বরূপ। যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে অন্যায়ভাবে আটক সাংবাদিকদের মুক্তি নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
