বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানালেন পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি কোন দিকে।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক আনুষ্ঠানিক বার্তার মাধ্যমে এই ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই ফোনালাপ কেবল একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্কের বরফ গলিয়ে একটি ‘ভবিষ্যমুখী অংশীদারত্ব’ গড়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদলের পর ইসলামাবাদের এই অতি-তৎপরতা কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অভিনন্দন ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক্স (সাবেক টুইটার) বার্তার তথ্য অনুযায়ী, ইসহাক দার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধির অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে বাণিজ্য, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়।
উভয় দেশই বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে (যেমন- সার্ক বা ওআইসি) একে অপরকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
তারেক রহমানকে ‘ভাই’ সম্বোধন: শাহবাজ শরিফের উষ্ণ বার্তা
এই ফোনালাপের কয়েকদিন আগেই বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এক উষ্ণ অভিনন্দন বার্তা পাঠান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে শাহবাজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপ্রধানদের স্তরে এই ধরণের সম্বোধন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এটি কেবল ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক নয়, বরং দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরণের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
শাহবাজ শরিফ তার বার্তায় দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও গভীর করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
ড. খলিলুর রহমান ও পাকিস্তানের ‘কানেকশন’ নিয়ে বিতর্ক
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাথে পাকিস্তানের এই নিবিড় যোগাযোগ নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে নানা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
সমালোচকদের একাংশ মনে করেন, ড. খলিলুর রহমানের পূর্বতন কর্মকাণ্ড এবং বর্তমানে পাকিস্তানের সাথে তার এই ঘনিষ্ঠতা তাকে ইসলামাবাদের একজন ‘নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এটি একটি নিয়মিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
তা সত্ত্বেও, অতি দ্রুত পাকিস্তানের এই অভিনন্দন এবং ঘনিষ্ঠতা ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর
ঢাকা ও ইসলামাবাদের এই ঘনিষ্ঠতাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আঞ্চলিক শক্তিগুলো।
বিশেষ করে ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের কাছে এই নতুন রসায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রেফারেন্স: পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘ডন’ (Dawn) এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার্স’ তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম প্রধান দুই দেশের মধ্যকার এই নতুন জোট গড়ার সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।
সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের বর্তমান শাসনকাঠামো পরিবর্তনের পর পাকিস্তান তাদের হারিয়ে যাওয়া প্রভাব ফিরে পেতে মরিয়া।
অর্থনীতির নতুন দুয়ার না কি অন্য কিছু?
ফোনালাপে দুই নেতা বাণিজ্য সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়েছেন।
বিগত দশকগুলোতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি জাহাজ চলাচল বা বাণিজ্য সুবিধা সীমিত ছিল।
ড. খলিলুর রহমান ও ইসহাক দারের এই আলোচনার পর ধারণা করা হচ্ছে:
- সরাসরি আকাশপথ ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হতে পারে।
- শিক্ষাবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা হবে।
- আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
ভারসাম্যের কূটনীতি না কি ঝুঁকির পথ?
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিবেশী ও উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখা। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করাই হবে তার প্রধান পরীক্ষা। ড. খলিলুর রহমানের এই ‘পাক-ঘনিষ্ঠতা’ শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য সুফল আনবে না কি নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দেবে, তা সময়ই বলে দেবে।
