অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন পুলিশি পোষাক নির্বাচনের উদ্যোগে বিপিএসএ-র গভীর উদ্বেগ। মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের মতামত উপেক্ষা ও আর্থিক ব্যয়ের বিষয়ে সংগঠনটির কড়া বিবৃতি।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা: বাংলাদেশ পুলিশের দীর্ঘদিনের পরিচিত পোষাক পরিবর্তনের উদ্যোগে বড় ধরনের ধাক্কা এসেছে খোদ বাহিনীর ভেতর থেকেই। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া নতুন পোষাক প্রবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএ)। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংগঠনটি এই সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা দাবি করেছে। বাহিনীর সদস্যদের দাবি, মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
পেশাদার মতামতের অভাব ও সাংগঠনিক ক্ষোভ
অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান স্বাক্ষরিত ওই বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, পোশাক পরিবর্তনের এই স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ায় কোনো পেশাদার সদস্য বা মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতামত নেওয়া হয়নি।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়:
“মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সদস্যদের রুচিকে গুরুত্ব না দিয়ে ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত বাহিনীর মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
কেন আগের পোশাকটিই সেরা?
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের দাবি অনুযায়ী, ২০০৩-০৪ সালের দিকে দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও যাচাই-বাছাইয়ের পর বর্তমান পোশাকটি নির্বাচন করা হয়েছিল।
এর পেছনে কাজ করেছিল বেশ কিছু যৌক্তিক কারণ:
- জলবায়ু উপযোগিতা: বর্তমান ইউনিফর্মটি বাংলাদেশের আর্দ্র ও ক্রান্তীয় আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে তৈরি, যা দীর্ঘসময় ডিউটি করার জন্য আরামদায়ক।
- শারীরিক বৈচিত্র্য: এ দেশের মানুষের গায়ের রঙের সাথে এই রঙের সামঞ্জস্যতা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।
- দীর্ঘস্থায়ী পরিচিতি: দীর্ঘ দুই দশক ধরে এই পোশাকে পুলিশকে দেখে সাধারণ মানুষ অভ্যস্ত, যা জনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে একটি মানসিক সুবিধা দেয়।
পরিচয় বিভ্রাট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
নতুন করে যে পোশাকটি নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে, তা নিয়ে অ্যাসোসিয়েশনের বড় শঙ্কা হলো ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’।
অভিযোগ উঠেছে, নতুন নকশাটি অন্য কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর ইউনিফর্মের সাথে হুবহু মিলে যেতে পারে।
যদি এমনটি হয়, তবে মাঠ পর্যায়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে পুলিশকে আলাদা করে চেনা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এর ফলে জরুরি প্রয়োজনে পুলিশের সাহায্য চাওয়া বা পুলিশের পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জনমনে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।
ব্যয়ের যৌক্তিকতা বনাম অর্থনৈতিক বাস্তবতা
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার যখন প্রধান লক্ষ্য থাকার কথা কিন্তু তখন পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের মতো বিপুল ব্যয়বহুল প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিপিএসএ। সংগঠনের মতে:
- বিপুল ব্যয়: হাজার হাজার পুলিশ সদস্যের জন্য নতুন সেট পোশাক তৈরি করা রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল আর্থিক বোঝা।
- বিকল্প প্রস্তাব: এই বিপুল পরিমাণ অর্থ নতুন ইউনিফর্মের পেছনে খরচ না করে থানার আধুনিকায়ন, লজিস্টিক সাপোর্ট বৃদ্ধি এবং টহল যানবাহনের সংকট মেটাতে ব্যয় করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হবে।
সংস্কার না কি কেবল সজ্জার পরিবর্তন?
সরকারের এই উদ্যোগকে অনেকে কেবল ‘বাহ্যিক পরিবর্তন’ হিসেবে দেখছেন।
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের দাবি অনুযায়ী, সংস্কার হতে হবে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দক্ষতায়, পোশাকে নয়।
লজিস্টিক সাপোর্ট ও থানায় প্রযুক্তির অভাব মেটানোই এখন বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।
সমঝোতার পথে হাঁটবে কি সরকার?
একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর ভেতর থেকে ওঠা এই আপত্তিকে সরকার কীভাবে গ্রহণ করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
বাহিনীর আধুনিকায়ন বনাম কেবল চাক্ষুষ পরিবর্তনের এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় কার হবে, তা সময় বলে দেবে।
তবে বিপিএসএ-র এই অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, অংশীজনদের বাদ দিয়ে নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্ত বাহিনীর ভেতরে অসন্তোষের বারুদ জমা করতে পারে।
