বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামের বিরুদ্ধে অফিস ভাড়া বকেয়া ও মালামাল সরিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
রাজধানীর হাতিরপুলের একটি অভিজাত অফিস কক্ষ ভাড়া নিয়ে দীর্ঘ পাঁচ মাস ভাড়া পরিশোধ না করা এবং পরবর্তীতে রাতের অন্ধকারে এসি ও আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামের বিরুদ্ধে। গত ১৩ মার্চ (শুক্রবার) দিবাগত রাতে রাজধানীর ১৮১ এলিফ্যান্ট রোডের একটি ভবনে এই ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীরা।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: যেভাবে শুরু হয়েছিল
জানা গেছে, হাতিরপুল কাঁচাবাজারের ঠিক বিপরীত পাশে অবস্থিত ১৮১ এলিফ্যান্ট রোডের দ্বিতীয় তলায় প্রায় দুই হাজার বর্গফুটের একটি সুসজ্জিত অফিস কক্ষ ভাড়া নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় গত বছরের নভেম্বর মাসে। অফিসটি আগে সাবেক ডাকসু জিএস গোলাম রাব্বানীর ‘টিম পজিটিভ বাংলাদেশ’-এর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
পরবর্তীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক তানিম সাহেদ রিপন পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সূত্রে অফিসটির ডেকোরেশন ও আসবাবপত্রের মালিকানা লাভ করেন।
ব্যবসায়িক মন্দার কারণে রিপন যখন অফিসটি ভাড়া দেওয়ার জন্য নোটিশ দেন, তখন হাসিব আল ইসলাম ও তার সহযোগী মুনতাসিম বিল্লাহ মাহফুজ সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান কার্যালয় করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
আর্থিক লেনদেন ও অলিখিত চুক্তি
অফিসটির দেখাশোনায় নিয়োজিত ফরহাদ হোসেনের ভাষ্যমতে, মাসিক ১ লাখ টাকা ভাড়া এবং ৮ লাখ টাকা অগ্রিম (অ্যাডভান্স) প্রদানের শর্তে হাসিব ও মাহফুজ অফিসটি নিতে রাজি হন। তবে তারা শুরুতে মাত্র ৩ লাখ টাকা প্রদান করেন এবং বাকি ৫ লাখ টাকা ও চলতি মাসের ভাড়া ১০ নভেম্বরের মধ্যে পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন।
ফরহাদ হোসেন বলেন,
“তাদের মৌখিক প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে আমরা কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই তাদের চাবি হস্তান্তর করি।
তবে সেই সময়ের ভিডিও ফুটেজ আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে।”
বকেয়া ভাড়া ও ‘নিশাচর’ তৎপরতা
অভিযোগ উঠেছে, গত নভেম্বর মাসে অফিসটি দখলে নেওয়ার পর থেকে হাসিব ও তার সহযোগীরা কোনো মাসিক ভাড়া বা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেননি।
দীর্ঘদিনের বকেয়া জমে যাওয়ায় সম্প্রতি ভবনের মালিক ঝুনু মিয়া ওই অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকে শুরু হয় রহস্যময় কর্মকাণ্ড।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পাশের দোকানদারদের দাবি, গত কয়েকদিন ধরে হাসিব ও তার লোকজন গভীর রাতে অফিসের মালামাল সরাতে শুরু করেন।
সবশেষ গত শুক্রবার রাতে ট্রাকযোগে আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী বের করার সময় স্থানীয়রা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তারা দ্রুত চাবি ফেলে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
এসি উধাও ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ
ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি অনুযায়ী, অফিসটিতে মোট ৯টি উন্নত মানের এয়ার কন্ডিশনার (এসি) ছিল।
কিন্তু শুক্রবারের ঘটনার পর দেখা যায়, সেখান থেকে ৮টি এসিই উধাও।
এ ছাড়া দামী সোফা, কম্পিউটার টেবিল এবং ডেকোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ভবন মালিক ঝুনু মিয়া বলেন, “আমি ভবনের উপরের তলায় থাকি।
সাব্বির নামে একজনের মাধ্যমে রিপন সাহেবরা এখানে অফিস নিয়েছিলেন।
এখন শুনছি ভাড়াটিয়ারা সব আসবাবপত্র খুলে নিয়ে গেছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”
চুরির অভিযোগ ও হাসিবের পাল্টা দাবি
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির নেতা তানিম সাহেদ রিপন বলেন-হাসিবের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি।
পরে তার একজন প্রতিনিধি দাবি করেছেন যে, তারা মালামাল নেননি বরং সেগুলো চুরি হয়ে গেছে।
সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার। আমরা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত হাসিব আল ইসলাম প্রথম দিকে বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে জানিয়েছেন যে, মাত্র দুই মাসের ভাড়া বাকি ছিল যা মিমাংসা করা হয়েছে। তবে মালামাল গায়েব হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে তার আইনি প্রতিনিধি মুনতাসিম বিল্লাহ মাহফুজের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
যদিও মাহফুজকে বারবার কল দিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তদন্তের অপেক্ষায় পুলিশ
ইতোমধ্যেই বিষয়টি স্থানীয় থানা পুলিশকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তারা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
একটি ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বে থেকে এ ধরনের অনৈতিক ও ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ ওঠায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখানো তরুণ নেতাদের ব্যক্তিগত সততা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
কেন এই ঘটনাটি উদ্বেগের?
১. নৈতিক স্খলন: যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তাদের বিরুদ্ধেই ভাড়া না দেওয়া ও মালামাল আত্মসাতের অভিযোগ আন্দোলনের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলতে পারে।
২. আইনি জটিলতা: লিখিত চুক্তি না থাকা সত্ত্বেও ডিজিটাল এভিডেন্স (ভিডিও) থাকায় হাসিব ও তার সহযোগীরা আইনি মারপ্যাঁচে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।
৩. নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতা: রাজধানীর একটি ব্যস্ত এলাকায় গভীর রাতে মালামাল সরিয়ে নেওয়া সাধারণ চুরির ঘটনা নাকি পরিকল্পিত আত্মসাৎ—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
উপসংহার
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ছাত্র নেতার বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়,
তবে তা ছাত্র আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
আপাতত পুলিশি তদন্ত এবং দুই পক্ষের সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার মাধ্যমেই সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব।
