ঈদের আগে ৫৪% কারখানায় বোনাস বাকি। শ্রমিকদের ক্ষোভ, মালিকদের ভিন্ন দাবি—বেতন-বোনাস নিয়ে দ্বন্দ্ব তীব্র।
ঈদের আগে বোনাস সংকট: ভিন্নমত ও বাস্তবতা
আসন্ন ঈদুল ফিতর সামনে রেখে দেশের শিল্প-কারখানাগুলোতে বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কারখানায় বোনাস দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
৫৪ শতাংশ কারখানায় বোনাস বাকি
সংশ্লিষ্ট একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে মোট ৩,৪২৯টি কারখানার মধ্যে প্রায় ১,৮৪৩টি কারখানায় এখনও ঈদের বোনাস পরিশোধ করা হয়নি। অর্থাৎ প্রায় ৫৪ শতাংশ কারখানা এখনো বোনাস দেয়নি।
একই সঙ্গে ৪১৫টি কারখানায় ফেব্রুয়ারি মাসের বেতনও পরিশোধ হয়নি বলে জানা গেছে। এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
সংগঠনগুলোর দাবি: প্রায় শতভাগ পরিশোধ
তবে রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
বিজিএমইএর তথ্যমতে, তাদের সদস্যভুক্ত ৯৬ শতাংশের বেশি কারখানায় ইতিমধ্যেই বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিকেএমইএ জানিয়েছে, তাদের সদস্য কারখানার প্রায় ৯৬.৫৫ শতাংশ বোনাস দিয়েছে এবং ৯৮ শতাংশের বেশি বেতন পরিশোধ করেছে।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ
শ্রমিক নেতারা বলছেন, বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু অভিযোগ করেন, অনেক কারখানা এখনও বেতন-বোনাস পরিশোধ করেনি।
তিনি বলেন, সরকার থেকে প্রণোদনা নেওয়ার পরও কিছু মালিক সেই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করেছেন, ফলে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আরেক শ্রমিক নেতা জলি তালুকদার বলেন, বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে শিল্প গড়ে তুললেও ঈদের সময় শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তিনি মালিকদের মানসিকতার পরিবর্তনের ওপর জোর দেন।
সরকারের নির্দেশনা ও সময়সীমা
গত ৩ মার্চ শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ৯ মার্চের মধ্যে ফেব্রুয়ারির বেতন
এবং ১২ মার্চের মধ্যে বোনাস পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলেই অভিযোগ উঠছে।
মালিকপক্ষের ব্যাখ্যা
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার দ্রুত বেতন-বোনাস দেওয়া হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, প্রায় সব সদস্য কারখানায় বেতন ও বোনাস পরিশোধ সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, গোয়েন্দা সংস্থা ও শিল্প পুলিশের প্রতিবেদনে এমন অনেক কারখানা অন্তর্ভুক্ত থাকে,
যেগুলো এই সংগঠনগুলোর সদস্য নয়। ফলে সামগ্রিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে সংগঠনগুলোর তথ্যের পার্থক্য তৈরি হয়।
ব্যাংক ঋণ ও প্রণোদনা বিতর্ক
মালিকপক্ষের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া ঋণ সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়, ফলে সেই
অর্থ অন্য খাতে ব্যবহারের সুযোগ নেই। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সম্ভাব্য প্রভাব ও উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঈদের আগে বেতন-বোনাস পরিশোধ না হলে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
অতীতে এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্দোলনের নজির রয়েছে।
ঈদকে ঘিরে বেতন-বোনাস সংকট নতুন কিছু নয়, তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্নমত ও পরিসংখ্যানগত দ্বন্দ্বে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় না হলে এই সংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে।
স্বচ্ছ তথ্য ও দ্রুত পদক্ষেপই পারে শ্রমিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে।
