দিল্লিতে গ্রেফতার লস্কর-ই-তইবার দুর্ধর্ষ জঙ্গি শব্বির আহমেদ লোন ওরফে রাজা। বাংলাদেশ থেকে আইএসআই-এর মদতে ভারতে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছিল এই কাশ্মীরি জঙ্গি।
দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা মানচিত্রে আবারও বড় ধরনের ঝাকুনি দিয়ে গেল লস্কর-ই-তইবার এক দুর্ধর্ষ জঙ্গির গ্রেফতারি। দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা তৎপরতা এবং দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের বিশেষ অভিযানে ধরা পড়েছে শব্বির আহমেদ লোন ওরফে ‘রাজা’। জানা গেছে, এই জঙ্গি কেবল ভারতের ভূখণ্ডেই নয়, বরং প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে বসে গড়ে তুলেছিল এক বিশাল ভারতবিরোধী নেটওয়ার্ক। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর সরাসরি নির্দেশে বাংলাদেশে ঘাঁটি গেড়ে ভারতে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী হামলার ছক কষছিল এই লস্কর সদস্য।
কে এই শব্বির লোন ওরফে ‘রাজা’?
গ্রেফতারকৃত শব্বির আহমেদ লোন জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগর জেলার কঙ্গন এলাকার বাসিন্দা। জঙ্গি সংগঠনের অন্দরে সে ‘রাজা’ বা ‘কাশ্মীরি’ নামেই সমধিক পরিচিত। গোয়েন্দাদের তথ্যমতে, সে লস্কর-ই-তইবার একজন উচ্চপ্রশিক্ষিত ক্যাডার। মুজাফ্ফরাবাদের লস্কর ক্যাম্পগুলোতে সে ‘দৌরা-এ-আম’ (প্রাথমিক প্রশিক্ষণ) এবং ‘দৌরা-এ-খাস’ (উন্নত সামরিক ও গেরিলা প্রশিক্ষণ) সম্পন্ন করেছে। প্রায় দুই দশক ধরে লস্করের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ: নতুন সেফ প্যাসেজ ও নিয়োগের আস্তানা?
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শব্বির লোন গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে আত্মগোপন করেছিল।
সেখান থেকেই সে তার নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। বাংলাদেশে অবস্থানরত অবৈধ অভিবাসী এবং কিছু উগ্রপন্থী ব্যক্তিকে সে রিক্রুট করার চেষ্টা করছিল। লস্করের পরিকল্পনা ছিল, ভারতীয় বা বাংলাদেশি নাগরিকদের ব্যবহার করে হামলা চালানো, যাতে হামলার পেছনে পাকিস্তানের সরাসরি সম্পৃক্ততা আন্তর্জাতিক মহলে আড়াল করা যায়।
আইএসআই-এর অর্থায়ন ও দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ থেকে সে নিয়মিত ভারতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা এবং নাশকতার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করত।
তার এই গ্রেফতারি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান নিরাপত্তা সহযোগিতার গুরুত্বকে আবারও সামনে এনেছে।
তিহাড় জেল থেকে জামিন এবং পুনরায় অন্তর্ঘাত
শব্বির লোনের অপরাধ জগতের ইতিহাস বেশ পুরনো। ২০০৭ সালে সে প্রথমবার দিল্লির স্পেশাল সেলের হাতে ধরা পড়েছিল।
সে সময় তার কাছ থেকে একে-৪৭ রাইফেল ও বিপুল পরিমাণ হ্যান্ড গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়।
তদন্তে দেখা গিয়েছিল, মুম্বই হামলার মূল হোতা হাফিজ সইদ এবং লস্কর কমান্ডার জাকি-উর-রহমান লাখভির সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল।
দীর্ঘ সময় দিল্লির তিহাড় জেলে বন্দি থাকার পর ২০১৮ সালে সে জামিনে মুক্তি পায়।
কিন্তু কারাগার থেকে বেরিয়ে সংশোধন হওয়ার পরিবর্তে সে সরাসরি বাংলাদেশে পালিয়ে যায় এবং সেখানে গিয়ে লস্করের নতুন স্লিপার সেল তৈরি করতে শুরু করে।
প্রোপাগান্ডা ও পোস্টার যুদ্ধ: লস্করের নতুন কৌশল
শব্বির লোনের গ্রেফতারের কয়েক দিন আগে দিল্লি ও দক্ষিণ ভারতের বেশ কিছু জায়গায় লস্কর ঘনিষ্ঠ একটি মডিউল গুঁড়িয়ে দিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো। ওই মডিউলটি দিল্লি ও কলকাতার বিভিন্ন জনবহুল স্থানে ভারতবিরোধী পোস্টার লাগিয়েছিল। গোয়েন্দারা মনে করছেন, কেবল সরাসরি হামলা নয়, বরং সাইবার স্পেস ও প্রোপাগান্ডা ব্যবহার করে ভারতের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করছিল লস্কর।
শব্বির লোন এই প্রোপাগান্ডা নেটওয়ার্কের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে যা থাকছে
দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন শব্বির লোনকে জেরা করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে:
- অর্থের উৎস (Funding): বাংলাদেশ ও ভারতে লস্করের কার্যক্রম সচল রাখতে অর্থ আসছে কোন পথে?
- স্লিপার সেল (Sleeper Cells): ভারতের বড় শহরগুলোতে আর কতজন লস্কর সদস্য ঘাপটি মেরে বসে আছে?
- টার্গেট (Potential Targets): আগামী কয়েক মাসের মধ্যে কোন কোন ভিভিআইপি বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা ছিল তাদের?
- নিয়োগের মাধ্যম (Recruitment Channels): সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনো গোপন অ্যাপ ব্যবহার করে তরুণদের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে কি না।
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মত
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ থেকে ভারতবিরোধী কার্যকলাপ চালানোর এই প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগের।
বাংলাদেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে লস্করের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতের ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ নীতির পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ দমনে দুই দেশের গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান আরও বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে।
শব্বির লোনের এই গ্রেফতারি সেই প্রচেষ্টায় একটি বড় ধাক্কা।
সতর্কতা ও আগামীর প্রস্তুতি
শব্বির আহমেদ লোন ওরফে রাজার গ্রেফতারি কেবল একটি সাফল্য নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা।
সীমান্তের ওপারে বসে শত্রুরা যখন নতুন ছক সাজাচ্ছে, তখন ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর এই তৎপরতা নিশ্চিতভাবেই বড় কোনো ট্র্যাজেডি রুখে দিল। তবে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক কতটা গভীরে প্রোথিত, তা বের করতে তদন্তের পরিধি আরও বাড়তে পারে।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ রুখতে দিল্লি এখন কঠোর অবস্থানের বার্তা দিচ্ছে।
শব্বির লোনকে দীর্ঘ মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে পুরো নেটওয়ার্ক ধ্বংস করাই এখন মূল লক্ষ্য।
