বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার। ৫৬ জেলায় ছড়িয়েছে সংক্রমণ, মৃত্যু ৫০ ছাড়িয়েছে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি বা ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’-কে দায়ী করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
বাংলাদেশে গত দুই দশকের মধ্যে হামের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৬টি জেলায় অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়েছে এই সংক্রামক ভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, গত দুই বছরে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের ক্ষেত্রে যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তার ফলেই দেশব্যাপী এই স্বাস্থ্য বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সংস্থার ঢাকা কার্যালয় থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সংক্রমণের হার এখন প্রতি ১০ লাখে ১৬.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
হটস্পটের তালিকায় ঢাকা ও রাজশাহী: আক্রান্তের সিংহভাগই শিশু
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৬৯ শতাংশের বয়স ২ বছরের নিচে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মোট আক্রান্তের ৩৪ শতাংশই এমন শিশু যাদের বয়স এখনো ৯ মাসও পূর্ণ হয়নি।
বর্তমানে ঢাকা বিভাগ সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু বা ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগেও দ্রুত সংক্রমণ বাড়ছে।
তবে এখন পর্যন্ত রাঙামাটি, বান্দরবান, মেহেরপুরসহ মাত্র ৮টি জেলায় কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি। বেসরকারি তথ্যানুযায়ী, দেশজুড়ে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ইতিমধ্যে ৫০ ছাড়িয়ে গেছে।

২০২৬-এর লক্ষ্যমাত্রা কি ভেস্তে যাচ্ছে?
বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে দেশ থেকে হাম ও রুবেলা নির্মূল করা।
২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সংক্রমণ প্রতি ১০ লাখে ১-এর নিচে থাকলেও, ২০২৬-এর গোড়াতেই সেই চিত্র পাল্টে গেছে।
বর্তমানে ২,১৯০ জন সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ৬৭৬ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জেনেভা কার্যালয়কে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের এই অবনতিশীল পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে।
কেন এই প্রাদুর্ভাব? নেপথ্যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) ঐতিহাসিকভাবে সফল হলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মৌলিক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক মূল্যায়ন বলছে:
- শূন্য ডোজ ও আংশিক টিকা: করোনা মহামারির সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে অনেক শিশু নিয়মিত ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
- সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী: টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের নিম্ন হারের কারণে এমন একদল শিশু তৈরি হয়েছে যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠেনি।
- অসম হার: বিভিন্ন অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদানের হারের পার্থক্য এই ভাইরাসের সহজ বিস্তারে সহায়তা করছে।
জনবল সংকট ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (IEDCR) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, কেবল টিকার অভাব নয়, বরং মাঠপর্যায়ে এবং জেলা পর্যায়ে উপযুক্ত জনবলের ঘাটতিও এই সংকটের অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, “সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় বসাতে হবে এবং টিকাদান কর্মসূচিতে স্থানীয় কমিউনিটিকে সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে। অন্যথায় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি পরামর্শ
হামের দেশব্যাপী বিস্তার ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকারকে বেশ কিছু ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ডব্লিউএইচও:
- ক্যাম্পেইন চালু: ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য সারা দেশে উচ্চমানের হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন দ্রুত শুরু করা।
- ভিটামিন এ সরবরাহ: আক্রান্ত শিশুদের যথাযথ ক্লিনিক্যাল সেবার পাশাপাশি উচ্চ ক্ষমতার ভিটামিন এ নিশ্চিত করা।
- নজরদারি বৃদ্ধি: প্রতিটি সন্দেহভাজন রোগীর পরীক্ষা এবং দ্রুত ফলাফল নিশ্চিত করা।
- ঝুঁকি যোগাযোগ: সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য দিয়ে সচেতন করা এবং গুজব রোধ করা।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস: পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াবে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, প্রাদুর্ভাব কতটুকু নিয়ন্ত্রণে আসবে তা নির্ভর করবে সরকারের সাড়াদান কার্যক্রমের গতি ও গুণগত মানের ওপর।
যদি আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত উচ্চ হারে টিকাদান নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বজায় থাকবে এবং নতুন নতুন এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হতে পারে।
শিশুদের জীবন রক্ষায় জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে এক ডোজ টিকাই পারে একটি শিশুর জীবন বাঁচাতে।
বর্তমানে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে হলে স্বাস্থ্য বিভাগকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হতে হবে।
২০২৬ সালের নির্মূল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এখন কেবল কাগজের হিসাব নয়, বরং এটি শিশুদের জীবন রক্ষার এক কঠিন যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।
