বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কৌশলগত জোট’ কি ভারতের জন্য হুমকি? ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ন্ত্রণ ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির নেপথ্য সমীকরণ নিয়ে একটি বিশেষ বিশ্লেষণ।
প্রফেসর ড. আরিফ খান | বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক;
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে এক অভূতপূর্ব মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি গভীর ‘কৌশলগত জোটে’ (Strategic Alliance) আবদ্ধ হচ্ছে, তখন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং প্রতিবেশী ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি কি আসলেই এ দেশের উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্বের জন্য, না কি এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখার একটি সুচতুর ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদ—তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
আওয়ামী লীগ ফ্যাক্টর ও ভারতের দোদুল্যমানতা
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ছিল ভারতের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং পরীক্ষিত অংশীদার।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত যখন কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে,
তখন তারা কার্যত তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক মিত্রকে আপস বা ‘কম্প্রোমাইজ’ করার ঝুঁকিতে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাপন্থী শক্তিকে গুরুত্বহীন করে তোলা ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী হতে পারে।
কারণ, বর্তমান প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান মার্কিন ঘনিষ্ঠতা দিল্লীর জন্য কৌশলগত বিকল্পগুলোকে সংকুচিত করে দিচ্ছে।
মার্কিন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি: নিরাপত্তা না কি সুচতুর প্রতারণা?
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ স্লোগানটি অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রচারিত হচ্ছে।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞ একে একটি ‘আই ওয়াশ’ বা দৃষ্টিবিভ্রমকারী প্রতারণা হিসেবে অভিহিত করছেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতি প্রায়শই একটি দেশের সার্বভৌমত্ব বা আঞ্চলিক শান্তি রক্ষার চেয়ে নিজেদের বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে একটি ‘বেস’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এই প্রক্রিয়ায় তারা একদিকে যেমন চীন ও পাকিস্তানের সফট পাওয়ারকে ভারতের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, তেমনি অন্যদিকে ভারতের সাথে চীন-পাকিস্তান-তুরস্কের বিরোধকে উসকে দিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করতে চাইছে।
অর্থাৎ, এই অঞ্চলে একটি চিরস্থায়ী সংঘাত জিইয়ে রাখাই যেন ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য।
NCNDA এবং ‘দাসত্ব’র নয়া সমীকরণ
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত বা কার্যকর হওয়া বিভিন্ন গোপন প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা চুক্তি, বিশেষ করে ‘নন-ক্লোজার অ্যান্ড নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’ (NCNDA)-এর মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশকে এক ধরণের ‘এনসলেভিং ট্রিটি’ বা দাসত্বমূলক চুক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। এই ধরণের চুক্তির ফলে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার চাবিকাঠি কার্যত বিদেশি শক্তির হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। যখন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র তার সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন তার স্বাধীনতা কেবল কাগুজে দলিলেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
আঞ্চলিক অস্থিরতা ও ‘ব্ল্যাকমেইল’ কূটনীতি
মার্কিন ছত্রছায়ায় বাংলাদেশের বর্তমান সরকার প্রতিবেশী দেশগুলোকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করার কৌশল নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ায় জাতিগত নিধন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন কিংবা সন্ত্রাসবাদকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যদি বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা হয়, তবে পুরো দক্ষিণ এশিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার কবলে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো—আঞ্চলিক দেশগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিয়ে নিজেকে একমাত্র ‘ত্রাতা’ বা ‘বিবাদ মিমাংসাকারী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
এতে আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মার্কিন অস্ত্র ব্যবসা এবং ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিরবচ্ছিন্ন থাকে।
জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সংকট
যখন কোনো দেশ বিদেশি শক্তির ‘প্রক্সি’ হিসেবে কাজ শুরু করে, তখন অভ্যন্তরীণ সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর নিরাপত্তা যেভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, তাকে অনেক বিশ্লেষক একটি পরিকল্পিত ‘ক্লিনসিং’ বা উচ্ছেদের অংশ হিসেবে দেখছেন।
অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করাই এই ধরণের অমানবিক কর্মকাণ্ডের নেপথ্য উদ্দেশ্য হতে পারে।
সার্বভৌমত্ব বনাম আধিপত্যবাদ
বাংলাদেশের বর্তমান নীতিনির্ধারকদের ভাববার সময় এসেছে যে, তারা কি একটি টেকসই আঞ্চলিক অংশীদারিত্বের পথে হাঁটবেন, না কি দূরবর্তী কোনো পরাশক্তির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবেন? ভারতের সাথে ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা বিশ্বস্ততার সম্পর্ক ছিন্ন করে আমেরিকান ‘টোপ’ গ্রহণ করা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।
শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক সংহতি রক্ষার জন্য প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি।
অন্যথায়, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ স্লোগানের আড়ালে দেশটি এক ভয়াবহ আঞ্চলিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে, যা কেবল ওয়াশিংটনের স্বার্থই রক্ষা করবে।
