ভর্তুকি প্রত্যাহার ও স্ল্যাব পরিবর্তনের অজুহাতে বিদ্যুতের দাম ২৯% বাড়ানোর পাঁয়তারা। বিপাকে দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত সমাজ। জানুন নেপথ্যের রাজনৈতিক চাল।
গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের মধ্যেই সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া করে তুলেছে বিদ্যুৎ খাতের নতুন এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তেল, গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দামের যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষের ওপর এবার আসতে চলেছে বিদ্যুতের বিলের এক বিশাল ধাক্কা। বর্তমান নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বিদ্যুতের মূল্য প্রায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকদের মতে, অগণতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে রাখার অপচেষ্টার অংশ হিসেবেই জনগণের পকেট কাটার এই নতুন ফাঁদ পাতা হচ্ছে। অতীতে সেনানিবাসের অন্ধকার থেকে জন্ম নেওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ও অস্থিতিশীল পরিবেশের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা জোট শাসনের এই নীতি মূলত সাধারণ মানুষকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ এবং একটি পরিকল্পিত সংকটের রূপরেখা
একটা সময় দেশের এক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুখে “আই হ্যাভ আ প্ল্যান” শীর্ষক সংলাপটি বেশ আলোচিত হয়েছিল। আজ দীর্ঘ সময় পর সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছেন, সেই পরিকল্পনা কি তবে দেশের খেটে খাওয়া আমজনতাকে তীব্র অর্থনৈতিক চাপে ফেলে নিষ্পেষিত করার?
বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুকৌশলে সাজানো হয়েছে। এর মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে:
- বিদ্যুতের ব্যবহারিক স্ল্যাব বা ধাপ পরিবর্তন।
- সরকারি ভর্তুকি ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।
- বিতরণ সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও লোকসানের বোঝা জনগণের ঘাড়ে চাপানো।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক সমন্বয় নয়, বরং জনগণের পকেট শূন্য করার এক সুনির্দিষ্ট ‘মাস্টারপ্ল্যান’। এর মাধ্যমে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দ্যটুকুকেও কেড়ে নেওয়ার আয়োজন সম্পন্ন করা হচ্ছে।
স্ল্যাবের মারপ্যাঁচ: সবচেয়ে বড় কোপ নিম্ন-মধ্যবিত্তের ঘাড়ে
এই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবনার সবচেয়ে নির্মম সত্যটি লুকিয়ে আছে এর স্ল্যাব পরিবর্তনের কৌশলের মধ্যে।
যে সমস্ত পরিবার মাসে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তারা সাধারণত সমাজের নিম্ন-মধ্যবিত্ত স্তরের প্রতিনিধি।
একটি ছোট পরিবার, গুটি কয়েক বাতি, পাখা আর একটি ফ্রিজ চালালেই এই পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়। নতুন এই পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসতে চলেছে ঠিক এই শ্রেণির ওপর।
একটি সহজ গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে এই করাল গ্রাসকে স্পষ্ট করা সম্ভব:
| ব্যবহারিক ইউনিট (মাসিক) | বর্তমান বিল (টাকা) | প্রস্তাবিত নতুন বিল (টাকা) | বৃদ্ধির হার (%) |
| ২০০ ইউনিট | ১২৯৫ টাকা | ১৬৪০ টাকা | প্রায় ২৭% |
ভাবা যায়, যে চাকুরিজীবী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মাস শেষে সংসার চালিয়ে নিজের ভবিষ্যতের জন্য মাত্র দশটি টাকাও সঞ্চয় করতে পারেন না, তার পকেট থেকে একঝটকায় অতিরিক্ত ৩৪৫ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ছক কষা হয়েছে।
সরকারের অলস নীতি, দূরদর্শিতার অভাব এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোটারদের। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর ধরে যে হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসান গুনছে, তার পেছনে রয়েছে সীমাহীন সিস্টেম লস, অপচয় আর দুর্নীতি। কিন্তু সেই দায় নিজেদের কাঁধে না নিয়ে, পুরো বোঝাটি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রাহকদের ওপর, যেন সাধারণ মানুষের কোনো জবাবদিহিতা চাওয়ার অধিকারই নেই।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অতীতেও একতরফা ও নামমাত্র ভোটারদের অংশগ্রহণে পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের অপচেষ্টা এদেশের মানুষ দেখেছে।
সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর মানসিকতা যেন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে তারা জনগণের মৌলিক চাহিদার ভাষা বুঝতে সম্পূর্ণ অক্ষম।
অংশগ্রহণহীন নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতাকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করার যে মানসিকতা, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে এমন জনবিরোধী নীতিমালার মাধ্যমে।
অন্যদিকে, এই শাসন ব্যবস্থার সহযোগী হিসেবে পর্দার আড়ালে যারা কলকাঠি নাড়ছে, তাদের অতীত ইতিহাসও প্রশ্নবিদ্ধ।
নীতি ও নৈতিকতার লম্বা চওড়া বুলি আওড়ালেও, ভেতরের সত্যটা অত্যন্ত নির্মম।
একের পর এক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চুক্তির মাধ্যমে দেশের জাতীয় সম্পদ বিদেশে পাচার এবং জনগণের কষ্টের উপার্জনকে শুষে নেওয়ার এক অলিখিত চুক্তি যেন কার্যকর রয়েছে।
ক্যাব-এর হুঁশিয়ারি: ক্যাপাসিটি চার্জ ও ডলারের কৃত্রিম ফাঁদ
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা দেশের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম এই প্রক্রিয়াটির তীব্র সমালোচনা করেছেন।
তার মতে, রেগুলেটরি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীন রায়কে প্রভাবিত করার জন্য এটি একটি নগ্ন অপচেষ্টা।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বিদ্যুৎ খাতের এই সংকটের মূল কারণ বৈশ্বিক নয়, বরং অভ্যন্তরীণ ভুল নীতি।
দেশের ভেতরে কতিপয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য যে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্র ভাড়া দেওয়ার নিয়ম চালু রাখা হয়েছে,
তা মূলত ডলারের দামের অজুহাত দেখিয়ে সাধারণ মানুষের রক্ত চোষার এক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামার দোহাই দিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন ফাঁদ পাতা হচ্ছে, যার একমাত্র শিকার এদেশের সাধারণ নাগরিক।
এটি রাজনীতি নয়, অর্থনৈতিক সন্ত্রাস
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো সেবা খাতের মূল্য নির্ধারণ করা হয় জনগণের ক্রয়ক্ষমতা এবং জনকল্যাণের কথা মাথায় রেখে।
কিন্তু বর্তমানের এই ২৯ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবনা কোনো সুস্থ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে পড়ে না।
সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করেন, এটি আসলে এক ধরনের প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক সন্ত্রাস।
কোনো যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াই, কেবল সাদা কাগজে কলমের এক খোঁচায় লাখ লাখ পরিবারের বাজেট ধ্বংস করে দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
গ্রাহকদের পকেট থেকে এই উপায়ে টাকা লুটে নিয়ে বিদ্যুৎ খাতের রাঘববোয়ালদের পকেট ভারী করার এই আয়োজন বন্ধ না হলে, আগামী দিনে দেশের অর্থনীতি এক গভীর ও অপরিবর্তনীয় মন্দার মুখে পতিত হবে, যা থেকে উত্তরণ সহজে সম্ভব নয়।
জনগণের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাওয়ার আগেই এই গণবিরোধী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা রাষ্ট্রের জন্য জরুরি।
