ওমান উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৩ ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু ও নতুন সংকটের নেপথ্যে ওয়াশিংটন-দিল্লি কৌশলগত টানাপোড়েনের বিশেষ বিশ্লেষণ।
পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা এক নজিরবিহীন ও জটিল সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। ওমান উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা বিশ্ব বাণিজ্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বড় ধরণের ঝাঁকুনি দিয়েছে। বিশেষ করে, এই অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর সরাসরি আগ্রাসনের শিকার হয়েছে এমন একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ, যেগুলোতে কর্মরত ছিলেন অসংখ্য ভারতীয় নাবিক।
ইতিমধ্যেই মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তিন জন ভারতীয় নাবিকের নির্মম মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে নয়াদিল্লি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন এবং দিল্লির দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও ‘মিত্রতা’ এক কঠিন মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার মুখে পড়েছে। পরাশক্তিদের এই সামরিক ব্লকেড বা অবরোধ এবং তার বিপরীতে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর নাবিকদের জীবনহানি আন্তর্জাতিক জলসীমায় এক নতুন সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত: ৩ ভারতীয় নাবিকের সলিল সমাধি
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটেছে হরমুজ প্রণালীর ওমান উপকূলে।
সেখানে পালাউয়ের (Palau) পতাকা পরিহিত ‘ম্যারিভেক্স’ (নথিভেদে সেত্তেবেলো) নামক একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। আমেরিকা কর্তৃক আরোপিত কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর চেষ্টা করছিল এই জাহাজটি। ঠিক তখনই মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোড়া মিসাইল সরাসরি আছড়ে পড়ে এই ট্যাঙ্কারের ওপর, যার ফলে মুহূর্তের মধ্যে পুরো জাহাজে দাউদাউ করে আগুন ধরে যায়।
জাহাজটিতে মোট ২৪ জন ক্রু মেম্বার বা নাবিক ছিলেন, যার মধ্যে ২১ জনকে অন্য একটি উদ্ধারকারী দল জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও তিন জন ভারতীয় নাবিক নিখোঁজ হয়ে যান। বৃহস্পতিবার ভারতের কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে, নিখোঁজ থাকা ওই তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছে। ইতিমধ্যে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং তাদের দেহ স্বদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য মোদী সরকার সমস্ত ধরণের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
‘এমটি জলবীর’ এর ওপর হামলা এবং আমেরিকার বুক ঠুকে স্বীকারোক্তি
ম্যারিভেক্স বা সেত্তেবেলোর ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত তিনদিনের মাথায় ওমান উপকূলে আবারও একটি ভারতীয় নাবিক বোঝাই বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন হামলার খবর আসে। এবার আক্রমণের শিকার হয়েছে ‘এমটি জলবীর’ (MT Jalveer) নামক একটি পণ্যবাহী ভেসেল, যেখানে কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় নাবিক কর্মরত ছিলেন। ওমান উপকূলে শিনাস বন্দরের কাছে এই হামলার পর বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই হামলার দায় কোনো আঞ্চলিক উগ্রপন্থী গোষ্ঠী বা ইরানের ওপর চাপানোর সুযোগ রাখেনি খোদ মার্কিন প্রশাসন।
আমেরিকার প্রতিরক্ষা বাহিনীর ‘আমেরিকান সেন্ট্রাল কম্যান্ড’ (CENTCOM) সরকারিভাবে এক বিবৃতির মাধ্যমে অত্যন্ত বুক ঠুকে স্বীকার করেছে যে,
ওমান উপকূলে ‘এমটি জলবীর’-এর ইঞ্জিন রুম লক্ষ্য করে তারাই দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘হেলফায়ার’ (Hellfire) মিসাইল ছুড়েছে।
কেন এই আগ্রাসন? ওয়াশিংটনের ‘নন-কমপ্লায়েন্ট’ যুক্তি
আমেরিকান সেন্ট্রাল কম্যান্ডের (CENTCOM) দাবি অনুযায়ী, ওমান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন কৌশলগত স্বার্থ এবং
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখতে তারা গত ১৩ এপ্রিল থেকে একটি বিশেষ সামরিক ব্লকেড বা সামুদ্রিক অবরোধ কার্যকর করেছে। তাদের অভিযোগ:
- গিনি-বিসাউয়ের পতাকা লাগানো ‘এমটি জলবীর’ নামক এই জাহাজটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরান থেকে অন্যত্র অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহনের চেষ্টা করছিল।
- মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং আকাশসীমা থেকে রেডিও বার্তার মাধ্যমে জাহাজটিকে বারবার থামার এবং নিজেদের পরিচয় নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
- কিন্তু জাহাজের ক্রু মেম্বাররা মার্কিনীদের সেই কড়া সতর্কবার্তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজেদের গতিপথে এগিয়ে যেতে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী জাহাজটিকে ‘নন-কমপ্লায়েন্ট ভেসেল’ বা অবাধ্য শত্রুভাবাপন্ন জাহাজ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তার গতি রুখে দিতে সরাসরি ইঞ্জিন রুম লক্ষ্য করে দুটি হেলফায়ার মিসাইল ছোড়ে। সেন্টকম আরও জানিয়েছে, এই অবরোধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত তারা প্রায় ৯টি এই ধরণের অবাধ্য জাহাজকে শক্তি প্রয়োগ করে থামিয়েছে।
দিল্লির তীব্র অসন্তোষ: মার্কিন কূটনীতিবিদকে তলব ও ডেমার্শ
নিজেদের মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত একটি দেশের সেনাবাহিনীর হাতে একের পর এক ভারতীয় নাবিকের প্রাণহানি এবং জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার এই ঘটনাকে কোনোভাবেই সহজভাবে নিতে পারছে না সাউথ ব্লক। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (MEA) মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এই ধারাবাহিক আক্রমণকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ এবং ‘একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে কড়া বার্তা দিয়েছেন।
সাউথ ব্লকের কূটনৈতিক পদক্ষেপ:
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার রাতেই দিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের প্রধান বা চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে (CDA) জরুরি ভিত্তিতে তলব করে একটি কড়া কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র বা ‘ডেমার্শ’ (Demarche) হস্তান্তর করেছে। বাণিজ্যিক নৌযানগুলোর ওপর এমন অন্ধ সামরিক আগ্রাসন বন্ধ করার জন্য ওয়াশিংটনকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ, বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলে কমপক্ষে এক কোটি ভারতীয় নাগরিক বসবাস ও কাজ করেন, এবং হরমুজ প্রণালীতে এই মুহূর্তে ১৩টি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজে ৫৬২ জন ভারতীয় নাবিক জীবন ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তাঁদের নিরাপত্তাই ভারতের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
ভারত-আমেরিকা ‘মিত্রতা’র ফাটল এবং ইতিহাসের শিক্ষা
উপসাগরীয় অঞ্চলের এই রক্তক্ষয়ী বাস্তব ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন ও জটিল সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে,
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কখনোই কোনো দেশের চিরস্থায়ী বা নিঃস্বার্থ বন্ধু হতে পারে না।
ওয়াশিংটন যখন নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের হিসাব কষে, তখন তারা তথাকথিত ‘মিত্র’ দেশের নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষার তোয়াক্কাও করে না।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই মার্কিন মনস্তত্ত্ব খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।
তিনি কখনোই মার্কিন প্রশাসনের কোনো প্রলোভন বা কূটনৈতিক ফাঁদে পা দেননি,
যা বর্তমান মোদী সরকারের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে।
বর্তমান দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা প্রয়োজন যে,
ভারত নিজেই একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি, যার নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
কোনো বিদেশি পরাশক্তির একতরফা সামরিক ব্লকেড মেনে নিয়ে নিজেদের নাগরিকদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভারতের কৌশলগত করণীয়
দক্ষিণ এশিয়া এবং এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভারতকে বহুমুখী ও কঠোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিজেদের নাবিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ অবস্থান নিতে হবে,
অন্যদিকে প্রতিবেশী অঞ্চলের নিরাপত্তার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং উগ্রপন্থী উপাদানগুলোর উত্থান সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।
ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামরিক কার্যক্রমকে আরও বেগবান এবং বাধাহীন করতে হলে,
অনতিবিলম্বে এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা ও চরমপন্থী নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আঞ্চলিক শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা গেলেই কেবল ভারত বিশ্বমঞ্চে নিজের পরাশক্তি হিসেবে অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারবে।
আত্মমর্যাদার কূটনীতিই একমাত্র পথ
হরমুজ প্রণালী ও ওমান উপসাগরে ভারতীয় নাবিকদের ওপর মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের এই আঘাত দিল্লির জন্য একটি বড় ধরণের ওয়েক-আপ কল বা সতর্কবার্তা।
পরাশক্তিদের অন্ধ অর্থনৈতিক যুদ্ধের খেসারত কেন উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ শ্রমজীবী নাবিকদের দিতে হবে—এই প্রশ্ন এখন বিশ্বমঞ্চে তোলা জরুরি।
ইঙ্গ-মার্কিন ব্লকের একচেটিয়া দাদাগিরি বরদাস্ত না করে, ভারতকে এখন চীন, রাশিয়া কিংবা ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সমীকরণ বজায় রাখতে হবে। একই সাথে নিজেদের নৌবাহিনীকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আরও সক্রিয় করে তুলতে হবে, যাতে কোনো পরাশক্তিই ভারতীয় নাগরিকদের ওপর হাত তোলার সাহস না পায়।
নিজের আত্মমর্যাদা এবং সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি কেবল ভারত এই বৈশ্বিক ঘূর্ণাবর্ত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে।
